একাঙ্গি চাষে সফল ইশতিয়াক, ১৫ লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন
ইশতিয়াক হাসান একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। সকালে কর্মস্থলের ব্যস্ততা, বিকেল কিংবা ছুটির দিনে কৃষিজমিতে ছুটে চলা। পেশায় ব্যাংকার হলেও কৃষির প্রতি ভালোবাসা থেকে নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখছেন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার চৌগাছা গ্রামের এই যুবক। চাকরির পাশাপাশি কৃষিকাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে শুরু করেছিলেন বিদেশি মসলা জাতীয় ফসল একাঙ্গির চাষ। বাংলায় একে ‘ভুঁই চম্পা’ বা ‘সুরভি আদা’ বলা হয়। তবে বাংলাদেশে এপি একাঙ্গি বা একানি নামে বেশি পরিচিত। এর উৎপত্তিস্থল দক্ষিণ চীন অথবা ভারত বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় এর চাষ করা হয়।
জানা যায়, ইশতিয়াক হাসান প্রথমবার এক বিঘা জমিতে চাষ করে ভালো ফলন ও লাভ পাওয়ার পর এবার চার বিঘা জমিতে করেছেন এর আবাদ। ফলন ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি। চাকরির কারণে দিনের বড় একটি সময় কর্মস্থলে কাটলেও কৃষির প্রতি তার আগ্রহ দীর্ঘদিনের। প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি তুলনামূলক লাভজনক ও নতুন কোনো ফসল চাষের চিন্তা থেকেই একাঙ্গির আবাদ শুরু করেন তিনি।
প্রথম বছর পরীক্ষামূলকভাবে এক বিঘা জমিতে একাঙ্গি চাষ করেন ইশতিয়াক। শুরুতে নতুন ফসল হওয়ায় কিছুটা শঙ্কা থাকলেও ফলন পাওয়ার পর সেই শঙ্কা কেটে যায়। ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে কাঙ্ক্ষিত দামে বিক্রি করতে পেরে লাভবান হন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আবাদ বাড়িয়ে চার বিঘা জমিতে একাঙ্গি চাষ করেছেন।
জমিতে দাঁড়িয়ে ইশতিয়াক হাসান বলেন, ‘কৃষির প্রতি ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ। চাকরির পাশাপাশি কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে চেয়েছি সব সময়। অন্যান্য অনেক ফসল চাষে উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ আশানুরূপ না হলেও একাঙ্গিতে তুলনামূলক ভালো লাভের সম্ভাবনা আছে। প্রথম বছর ভালো ফলন পাওয়ায় এবার আবাদ বাড়িয়েছি।’
তার হিসাবে, এক বিঘা জমিতে একাঙ্গি চাষ করে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। বাজারে প্রকারভেদে প্রতি মণ একাঙ্গি প্রায় ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়। ফলে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও কৃষকের ভালো লাভের সুযোগ আছে। তবে শুধু লাভের হিসাবেই থেমে নেই ইশতিয়াকের স্বপ্ন। তার মতে, একাঙ্গি চাষে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের বীজ, রোগবালাই দমন, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা এবং বাজারজাতকরণ বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে এ অঞ্চলে এই ফসলের আবাদ আরও বাড়ানো সম্ভব।
ইশতিয়াকের জমির পাশেই এবার একাঙ্গি চাষ করেছেন কৃষক কিরন হোসেন। আগে প্রচলিত বিভিন্ন ফসল চাষ করলেও ইশতিয়াকের সফলতা দেখে নতুন এই ফসলের দিকে ঝুঁকেছেন তিনি। কৃষক কিরন হোসেন বলেন, ‘ইশতিয়াক ভাই প্রথমে এক বিঘা জমিতে চাষ করে লাভ করেছেন। তার জমির ফলন ও বাজারদর দেখে আমিও আগ্রহী হয়েছি। এ বছর দেড় বিঘা জমিতে একাঙ্গি চাষ করেছি। ফলন ও দাম ভালো পেলে আগামী বছর কয়েকগুণ জমিতে আবাদ করব।’
শুধু কিরন হোসেনই নন, ইশতিয়াকের সাফল্য দেখে আশপাশের অনেক কৃষকই একাঙ্গি চাষের দিকে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তাদের একজন কৃষক মিঠু হোসেন। তিনি জানান, প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি নতুন কোনো লাভজনক ফসল চাষের সুযোগ খুঁজছিলেন। একাঙ্গির ফলন ও বাজারদর সম্পর্কে জানতে পেরে তিনি জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে এর আবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কৃষক মিঠু হোসেন আরও জানান, নতুন ফসল হওয়ায় প্রথমে একটু ভয় ছিল। কিন্তু ইশতিয়াকের জমিতে ফলন দেখে আগ্রহ বেড়েছে। কৃষি অফিস থেকে সঠিক পরামর্শ পাওয়া গেলে আগামী মৌসুমে আরও জমিতে একাঙ্গি চাষ করার পরিকল্পনা আছে।
কৃষক সাইদুর রহমান জানান, কৃষকেরা সাধারণত ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজসহ প্রচলিত ফসল চাষ করেন। কিন্তু কোনো কোনো সময় এসব ফসলে খরচ অনুযায়ী লাভ পাওয়া যায় না। নতুন ও লাভজনক ফসলের বিষয়ে কৃষকদের ধারণা দেওয়া হলে তারা ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হবেন। একাঙ্গির বাজার যদি স্থিতিশীল থাকে, তাহলে এটি কৃষকদের জন্য ভালো একটি বিকল্প হতে পারে।
কৃষক রফিকুল ইসলামও একাঙ্গি চাষের প্রতি আগ্রহের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘ইশতিয়াক বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন, তারপরও কৃষির সঙ্গে যুক্ত আছেন—এটা আমাদের জন্য উৎসাহের। তার জমিতে ফলন ভালো হওয়ায় অনেকেই এখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন। আগামী মৌসুমে আমিও কিছু জমিতে একাঙ্গি চাষ করার কথা ভাবছি।’
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন ফসল হওয়ায় একাঙ্গি চাষের পদ্ধতি, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা এবং বাজারজাতকরণ নিয়ে অনেকেরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই। এ কারণে কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ে নিয়মিত সহযোগিতা চান তারা।
মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কাজী শাহনেয়াজ জানান, জেলায় বর্তমানে প্রায় ১১ হেক্টর জমিতে একাঙ্গি আবাদ হয়েছে। নতুন এই ফসলের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। চাষে আগ্রহী কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। নতুন কোনো ফসল সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন ভালো হলেই হবে না; বাজারজাতকরণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক যেন উৎপাদনের পর ন্যায্যদামে ফসল বিক্রি করতে পারেন, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।’



