বিদেশ

‘মেড ইন ইউরোপ’ কর্মসূচিতে যুক্ত হতে পারলে ইইউ শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে ৪৫০ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে প্রস্তুত যুক্তরাজ্য

ঐইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচ কমিয়ে ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের সমপর্যায়ে নিয়ে আসতে বছরে সর্বোচ্চ ৪৫০ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করতে প্রস্তুত দেশটির সরকার। তবে এ সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় শর্ত রয়েছে। ইইউর প্রস্তাবিত ‘মেড ইন ইউরোপ’ শিল্প কর্মসূচিতে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে ব্রাসেলসকে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে আসা শিক্ষার্থীরা ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি দিয়ে পড়াশোনা করতে পারবেন। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে সরকার কয়েকশ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করতেও রাজি।

তবে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বিনিময়ে উল্লেখযোগ্য সুবিধা না পেলে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি কমানোর বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রধান লক্ষ্য হলো ইইউর ‘মেড ইন ইউরোপ’ শিল্প কর্মসূচিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

এই কর্মসূচির আওতায় ইউরোপের বাইরের দেশগুলোর পণ্যের ওপর বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে যুক্তরাজ্য অংশ নিতে পারলে ইউরোপীয় বাজারে ব্রিটিশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছে সরকার।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি বলেন, ইউরোপীয়দের টিউশন ফি-সংক্রান্ত দাবি মেনে নিতে যুক্তরাজ্য প্রস্তুত। তবে এর বিনিময়ে উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন করতে হবে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হচ্ছে ‘মেড ইন ইউরোপ’ কর্মসূচিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

আগামী ২০ নভেম্বর ব্রাসেলসে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহুল প্রত্যাশিত শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কয়েক মাস ধরে চলা আলোচনায় ওই সম্মেলনের আগে বেশ কয়েকটি বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার বিষয়ে নিজের অঙ্গীকার তুলে ধরতে সম্মেলনটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।

এদিকে ইইউর শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি কমানোর উদ্যোগ যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্ক তৈরি করতে পারে। কারণ, দেশটির অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থী বর্তমানে নিজেদের স্টুডেন্ট লোন পরিশোধের নিয়ম পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছেন।

ইউরোপীয় কর্মকর্তারা চাইছেন, তাদের দেশের শিক্ষার্থীদের বছরে ৯ হাজার পাউন্ডের কিছু বেশি টিউশন ফি দিতে হবে। অথচ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই ফি ৬০ হাজার পাউন্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ বিষয়টি নিয়ে চলতি বছর দুই পক্ষের আলোচনায় অচলাবস্থাও তৈরি হয়েছিল।

এদিকে যুক্তরাজ্যের সাবেক অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভস ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক স্বার্থ, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং ভৌগোলিক বাস্তবতা—সবকিছুই ইউরোপের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক আরও গভীর করার পক্ষে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলবেন, ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুফল ব্রিটিশ জনগণের সামনে তুলে ধরা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ইউরোপকে বোঝাতে হবে যে যুক্তরাজ্য সমঝোতায় আগ্রহী এবং সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে আন্তরিক।

আলোচনায় ইতোমধ্যে কয়েকটি বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে কার্বন নিঃসরণ বাণিজ্য, কৃষিপণ্য এবং তরুণদের চলাচল-সংক্রান্ত একটি বিশেষ কর্মসূচি। প্রস্তাবিত যুব চলাচল কর্মসূচির আওতায় সর্বোচ্চ ৮০ হাজার তরুণ ইউরোপীয় নাগরিক যুক্তরাজ্যে এসে কাজ, বসবাস ও পড়াশোনার সুযোগ পেতে পারেন। যদিও ইইউর কয়েকটি সদস্যদেশ ১ লাখ থেকে দেড় লাখ পর্যন্ত তরুণের জন্য সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। কেউ কেউ কোনো সংখ্যাগত সীমা না রাখার পক্ষেও মত দিয়েছেন।

এ ছাড়া ইউরোপের বায়োমেট্রিক তথ্যভান্ডারে যুক্তরাজ্যের প্রবেশাধিকার নিয়েও দুই পক্ষ সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে আশ্রয়প্রার্থীদের শনাক্ত ও তাদের চলাচল পর্যবেক্ষণে ব্রিটিশ সরকার সুবিধা পেতে পারে।

তবে দুটি বিষয় এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে। প্রথমত, ‘মেড ইন ইউরোপ’ শিল্প কর্মসূচিতে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয়ত, ইইউর শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি কমানো।

ব্রিটিশ সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ ও উচ্চাভিলাষী সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করা, ব্রিটিশ শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করাই তাদের লক্ষ্য।

আগামী ২০ নভেম্বরের সম্মেলনকে সামনে রেখে বুধবার ইইউর রাষ্ট্রদূতদের কাছে যৌথ বিবৃতির প্রথম খসড়া উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এরপর সম্মেলনের দিন পর্যন্ত এতে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনা যাবে।

সব মিলিয়ে, শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার ব্যয় কমানোর প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমঝোতার পথ তৈরি হচ্ছে। তবে বছরে ৪৫০ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ‘মেড ইন ইউরোপ’ কর্মসূচিতে যুক্তরাজ্যের প্রবেশাধিকার পাওয়ার ওপর।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button