ভ্রমণ

মেঘের রাজ্যে এক দিন: মালয়েশিয়ার গেনথিং হাইল্যান্ডে এক স্বপ্নযাত্রা

Shahabuddin Shuvo
Editor : Obhibason অভিবাসন
Editor in Chief    : SylhetPedia সিলেটপিডিয়া   কিছু ভ্রমণ থাকে, যা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু মন থেকে কখনো নামে না। টিকিটের কাগজ হারিয়ে যায়, ব্যাগের ধুলো ঝেড়ে ফেলা হয়, ছবিগুলো একসময় মোবাইলের গ্যালারিতে হারিয়ে যায়। তবু কোনো এক নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায়, কিংবা ব্যস্ত দিনের ক্লান্তির ফাঁকে হঠাৎ সেই স্মৃতি ফিরে আসে, আর মনটা এক নিমেষে চলে যায় অনেক দূরে। মালয়েশিয়ার গেনথিং হাইল্যান্ড আমার কাছে তেমনই এক স্মৃতি।

Shahabuddin Shuvo
Editor : Obhibason অভিবাসন
Editor in Chief    : SylhetPedia সিলেটপিডিয়া   মাটি ছেড়ে আকাশের পথে

কুয়ালালামপুর থেকে ঘণ্টাখানেকের পথ পেরিয়ে পৌঁছালাম পাহাড়ের পাদদেশে। সেখান থেকে শুরু হলো আসল যাত্রা। ক্যাবল কারের স্কাইওয়ের কাচঘেরা কেবিনে বসে মনে হলো, আমি যেন অন্য কোনো জগতের টিকিট কেটেছি। কেবিন ধীরে ধীরে মাটি ছাড়ল। নিচে ঘন সবুজ বৃষ্টিবনের ঢেউ, গাছের মাথাগুলো যেন সবুজ মখমলের চাদর। কেবিন যত ওপরে উঠছিল, বুকের ভেতরটা তত হালকা হয়ে আসছিল। তারপর হঠাৎ এল মেঘ। সাদা, নরম, নিঃশব্দ। এক মুহূর্তে চারপাশ ঢেকে গেল, জানালার কাচে জমল ফোঁটা ফোঁটা আর্দ্রতা। মনে হলো সময় থেমে গেছে, আর আমি ভেসে চলেছি এক শুভ্র স্বপ্নের ভেতর দিয়ে।

প্রযুক্তির দিক থেকেও এ এক বিস্ময়। জানা গেল, বর্তমান আওয়ানা স্কাইওয়ে চালু হয়েছে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২,৬৪২ মিটার, আর যাত্রাপথে প্রায় ৬৩০ মিটার উচ্চতা অতিক্রম করতে হয়। সময় লাগে মাত্র দশ মিনিটের মতো। অথচ সেই দশ মিনিটে যা দেখেছি, যা অনুভব করেছি, তা ভাষায় বলে শেষ করার নয়। কিছু কেবিনের মেঝে কাচের তৈরি। সেখানে দাঁড়ালে পায়ের নিচে অতল সবুজ, আর বুকের ভেতর একসঙ্গে ভয় ও বিস্ময়ের শিহরন।

পাশের আসনে বসা এক বৃদ্ধ চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। চোখ দুটো ছলছল করছিল। হয়তো তাঁর জীবনের কোনো পুরোনো স্বপ্ন আজ পূরণ হয়েছে। সত্যি বলতে, এমন দৃশ্য দেখলে মনের অজান্তেই চোখ ভিজে আসে।

পাহাড়ের চূড়ায় নতুন এক পৃথিবী

ওপরে পৌঁছে দেখি, পাহাড়ের মাথায় যেন এক নতুন শহর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৭২৫ মিটার উচ্চতায় এই শহরে বাতাসে ঠান্ডার পরশ। নিচের ভ্যাপসা গরম যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। গায়ে জড়িয়ে নিলাম হালকা জ্যাকেট, আর বুক ভরে নিলাম পাহাড়ি বাতাস।

শপিংমল, রেস্তোরাঁ, থিম পার্ক, হোটেল, সবকিছুর ভিড়েও এক ধরনের স্নিগ্ধতা আছে এখানে। শিশুরা ছুটছে, তরুণরা ছবি তুলছে, দম্পতিরা হাত ধরে হাঁটছে। সবার মুখেই এক অদ্ভুত খুশির ছাপ। কুয়াশা যখন শহরটাকে আলতো করে ঢেকে দেয়, তখন আলোগুলো ঝাপসা হয়ে এক রূপকথার দৃশ্য তৈরি করে।

মন্দিরের নীরবতায়

আওয়ানা স্কাইওয়ের মাঝপথে রয়েছে চিন সি স্টেশন। একই টিকিটে সেখানে নেমে চিন সি ক্যাভ টেম্পল ঘুরে দেখা যায়। সেখানে নামতেই মনে হলো, হইহুল্লোড়ের মাঝখানে হঠাৎ এক শান্ত দ্বীপে এসে পড়েছি। পাহাড়ের গায়ে মন্দির, চারপাশে কুয়াশা, ধূপের মৃদু গন্ধ। কেউ নীরবে প্রার্থনা করছেন, কেউ শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন।

ধর্ম যাই হোক, এমন নির্জনতায় মানুষ নিজের ভেতরের কথা শুনতে পায়। আমিও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবলাম, জীবনের এত ছুটোছুটির মাঝে কবে শেষবার এভাবে থেমে প্রকৃতির দিকে তাকিয়েছি।

যা জেনে গেলে ভালো হয়

গেনথিং ভ্রমণে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলে অভিজ্ঞতা আরও সুন্দর হয়:

  • সময়: আওয়ানা স্কাইওয়ে সাধারণত সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চলে। সকালে গেলে ভিড় কম থাকে, আর ভাগ্য ভালো থাকলে মেঘের দৃশ্য আরও স্পষ্ট দেখা যায়।
  • পোশাক: পাহাড়ে ঠান্ডা ও কুয়াশা থাকে, তাই হালকা জ্যাকেট রাখা ভালো।
  • টিকিট ও খরচ: টিকিটের দাম সময়ের সঙ্গে বদলায়। যাওয়ার আগে অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে হালনাগাদ তথ্য দেখে নেওয়া উচিত।
  • খাবার: মুসলিম পর্যটকদের জন্য হালাল রেস্তোরাঁ আছে। কেনার আগে হালাল সনদ দেখে নেওয়াই নিরাপদ।
  • রক্ষণাবেক্ষণ: মাঝে মাঝে আওয়ানা স্কাইওয়ে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ থাকে, তখন অন্য ক্যাবল কার চালু থাকে। তাই আগে খোঁজ নিয়ে যাওয়া ভালো।

ফেরার পথে

সন্ধ্যা নেমে এল। পাহাড়ের চূড়ায় একে একে আলো জ্বলে উঠল। ফেরার ক্যাবল কারে বসে নিচের দিকে তাকালাম। অন্ধকার বনের মাঝে দূরের শহরের আলো যেন ছড়িয়ে থাকা তারার মতো ঝিকমিক করছে। কেবিনের ভেতর সবাই চুপ। কারও মুখে কথা নেই। হয়তো সবাই একই কথা ভাবছিলাম: এই দিনটা যদি আরও একটু লম্বা হতো!

গেনথিং আমাকে শিখিয়েছে, সৌন্দর্য আসলে কোনো দূরের জিনিস নয়। কখনো কখনো তা অপেক্ষা করে মেঘের ওপারে, শুধু একটু সাহস করে ওপরে ওঠার অপেক্ষায়। সেই মেঘের ভেতর দিয়ে ভেসে যাওয়ার অনুভূতি আমি কোনোদিন ভুলব না।

যাঁরা প্রকৃতি ভালোবাসেন, যাঁরা জীবনের ব্যস্ততা থেকে একটু বিরতি চান, তাঁদের বলব, একবার অন্তত গেনথিং ঘুরে আসুন। হয়তো আপনিও মেঘের ভেতর হারিয়ে গিয়ে খুঁজে পাবেন নিজেকে।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button