যুক্তরাজ্যের বাজেটে জ্বালানি বিলে ১০০ ব্রিটিশ পাউন্ড সহায়তা, ব্যাংকের মুনাফায় কর বৃদ্ধি
যুক্তরাজ্যের চ্যান্সেলর জন হিলি তাঁর প্রথম বাজেটে লাখ লাখ পরিবারকে জ্বালানি বিল পরিশোধে এককালীন ১০০ পাউন্ড সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ব্যাংকগুলোর মুনাফার ওপর কর বাড়িয়ে এই সহায়তার অর্থ জোগাড় করা হবে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় থেকে সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পরিবারগুলোকে আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়াই সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
বাজেট ঘোষণায় হিলি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি চাপের মুখে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদ তৈরি করতে চায় সরকার।
ইংল্যান্ডে কাউন্সিল ট্যাক্স ব্যান্ড A থেকে D-এর আওতায় বসবাসকারী পরিবারগুলো এককালীন ১০০ পাউন্ড সহায়তা পাবে। ওয়েলস সরকারও একই ধরনের সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। স্কটিশ সরকারও এই সহায়তা কার্যক্রম অনুসরণ করার পরিকল্পনা করছে।
এ ছাড়া ২০২৭ সালে, অথবা যত দ্রুত সম্ভব, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে গ্যাসের নির্দিষ্ট দৈনিক চার্জ বা স্ট্যান্ডিং চার্জ বাতিল করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমানে গ্রাহকদের গ্যাস ব্যবহার না করলেও এই নির্দিষ্ট চার্জ দিতে হয়। নতুন ব্যবস্থায় এই খরচ গ্যাসের প্রতি ইউনিটের দামের সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে কম গ্যাস ব্যবহারকারী কিছু গ্রাহক উপকৃত হলেও বেশি গ্যাস ব্যবহারকারীদের বিল বেড়ে যেতে পারে।
পেট্রল ও ডিজেলের ওপর প্রতি লিটারে ৫ পেন্সের সাময়িক শুল্কছাড়ও জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হলো বড় ব্যাংকগুলোর মুনাফার ওপর কর ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ শতাংশ করা। নতুন হার আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া উচ্চ ঝুঁকির জুয়া খেলার মেশিনের ওপর কর বাড়ানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বাড়ানো এবং জনসাধারণের জন্য সহায়তা কর্মসূচির অর্থ জোগাড় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী এপ্রিল থেকে যুক্তরাজ্যে ন্যূনতম মজুরির হার ৩.৯ শতাংশ বাড়ানো হবে। তবে বয়স্ক ও তরুণ কর্মীদের ন্যূনতম মজুরির মধ্যে ব্যবধান কমানোর ক্ষেত্রে নতুন কোনো অগ্রগতি ঘোষণা করা হয়নি।
অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের হাই স্ট্রিটের দোকান ও ছোট ব্যবসার জন্য ব্যবসায়িক করের ছাড় বাড়ানো হয়েছে। ব্যবসায়িক কর প্রযোজ্য হওয়ার সীমা ১২ হাজার পাউন্ড থেকে বাড়িয়ে ১৮ হাজার পাউন্ড করা হবে। তবে ভেপের দোকান ও প্রাপ্তবয়স্কদের গেমিং সেন্টার এই সুবিধার বাইরে থাকবে।
সরকারের লক্ষ্য, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসাকে সহায়তা করা এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো।
বাজেটে কিছু করছাড়ের পাশাপাশি নতুন করের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আয়কর প্রদানের সীমা অপরিবর্তিত থাকবে। ফলে আয় বাড়লেও অনেক করদাতাকে আগের তুলনায় বেশি কর দিতে হতে পারে।
২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে বেসিক রেটের করদাতাদের সঞ্চয় ও বাড়িভাড়া থেকে আয়ের ওপর করের হার ২২ শতাংশের পরিবর্তে ২৪ শতাংশ করা হবে।
তবে নগদ ISA-তে বছরে করমুক্ত সঞ্চয়ের সীমা ২০ হাজার পাউন্ড থেকে কমিয়ে ১২ হাজার পাউন্ড করার আগের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। এতে সঞ্চয়কারীরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।
যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি (OBR) আগামী বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ১ শতাংশ করেছে। পরবর্তী বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার যে ধীরগতির হতে পারে, তা স্পষ্ট।
OBR-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাবের এক দশক পরেও ব্রিটিশ পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি সীমিত থাকতে পারে। একই সঙ্গে চলতি বছরে সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় ১৪ বিলিয়ন পাউন্ড বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে বড় ধরনের করছাড় বা ব্যাপক আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সুযোগ সীমিত রয়েছে।
প্রতিরক্ষা খাতে ৪.৭ বিলিয়ন পাউন্ডের অর্থসংকট পূরণের জন্য বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মূলধনী বাজেট থেকে অর্থ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন হিলি।
তবে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় আয়ের ৩ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩.৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে পূরণ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা আগামী বছরের ব্যয় পর্যালোচনায় প্রকাশ করা হবে।
বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক অভিযোগ করেছেন, প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে এখনই স্পষ্ট পরিকল্পনা দেওয়া উচিত ছিল। তাঁর দাবি, সরকারের বাজেট যথেষ্ট সাহসী নয় এবং অতিরিক্ত ঋণ, করের বোঝা ও কল্যাণমূলক ব্যয়ের চাপ অর্থনীতিকে দুর্বল করছে।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ভাতা (PIP) নিয়ে পর্যালোচনা শেষ হওয়ার পর কল্যাণমূলক ব্যয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাজেট ঘোষণার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনক বাজেটকে অপর্যাপ্ত বলে সমালোচনা করেছেন। লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা এড ডেভি বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে সাহসী পদক্ষেপ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে।
রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজের মতে, বাজেটে কিছু ছোটখাটো সুবিধা থাকলেও প্রতিরক্ষা খাতের জন্য কার্যকর পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।
ইনস্টিটিউট ফর ফিসকাল স্টাডিজের পরিচালক হেলেন মিলারও মনে করেন, বাজেটে বেশ কিছু ছোট পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় পরিবর্তন আনার মতো উদ্যোগ খুব কম।
শ্রমিক সংগঠন ইউনাইটের সাধারণ সম্পাদক শ্যারন গ্রাহাম বলেছেন, ১০০ পাউন্ডের জ্বালানি সহায়তা এবং গ্যাসের নির্দিষ্ট চার্জ বাতিলের উদ্যোগ স্বাগতযোগ্য হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কিও বাজেটের সমালোচনা করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, জন হিলির প্রথম বাজেটে জ্বালানি বিলে এককালীন সহায়তা, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং ছোট ব্যবসার জন্য করছাড়ের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের মুনাফায় কর বৃদ্ধি ও অন্যান্য করের মাধ্যমে এসব উদ্যোগের অর্থ জোগাড়ের পরিকল্পনা করছে সরকার।
তবে দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি ব্যয় এবং প্রতিরক্ষা খাতের অর্থসংকট সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ১০০ পাউন্ডের সহায়তা পরিবারগুলোকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সরকার কতটা সফল হয়, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের ওপর।



