প্রবাসহাইলাইটস

চীনের বুকে এক টুকরো বাংলাদেশ, নাম সানইউয়ানলি

বাংলা ভাষা, দেশীয় খাবার আর বাঙালির আড্ডায় মুখর গুয়াংজুর এই এলাকা; ক্যান্টন ফেয়ারে আসা বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের অন্যতম মিলনকেন্দ্র

আহমাদুল কবির, জুয়াংজু (চীন) থেকে:চীনের ব্যস্ত নগরী গুয়াংজু। চারদিকে চীনা ভাষার কোলাহল, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের আনাগোনা। অথচ শহরের একটি এলাকায় পা রাখলেই দৃশ্যপট বদলে যায়। কানে ভেসে আসে প্রাণের ভাষা বাংলা। রাস্তার পাশে বাংলায় লেখা সাইনবোর্ড, রেস্টুরেন্টে দেশীয় খাবারের ঘ্রাণ, আর টেবিলে বসে বাঙালিদের প্রাণখোলা আড্ডা। মনে হবে, চীনে নয়, যেন বাংলাদেশের কোনো এক পরিচিত জনপদে এসে দাঁড়িয়েছেন।
এটি চীনের গুয়াংডং প্রদেশের গুয়াংজু শহরের সানইউয়ানলি এলাকা। বাংলাদেশিদের কাছে পরিচিত ‘সানআলী’ নামে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে এলাকাটি যেন চীনের বুকে এক টুকরো বাংলাদেশ।
সানইউয়ানলির রাস্তায় হাঁটলেই চোখে পড়ে একের পর এক বাংলাদেশি খাবারের দোকান। হ্যালো বাংলাদেশ, স্টার কাবাব, রাঁধুনী, রিজিকিসহ বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায় দেশীয় খাবার। পাশাপাশি রয়েছে পোশাক, জুতা, ব্যাগ, প্রসাধনী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান। এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর সঙ্গেই জড়িয়ে আছেন বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা।
আহমাদুল কবির, জুয়াংজু (চীন) থেকে:বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা ক্যান্টন ফেয়ারে অংশ নিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের পদচারণায় এলাকাটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কেউ রেস্টুরেন্টে বসে খাবার খাচ্ছেন, কেউ পরিচিতজনদের সঙ্গে গল্প করছেন, আবার কেউ পণ্যের দরদাম কিংবা ব্যবসায়িক যোগাযোগ নিয়ে ব্যস্ত। অচেনা দেশে পরিচিত মুখের দেখা পাওয়া, মাতৃভাষায় কথা বলা আর দেশীয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ সব মিলিয়ে সানইউয়ানলি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশিদের এক অনানুষ্ঠানিক মিলনকেন্দ্র।
এলাকাটি ঘুরে দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা এখানে ব্যাগ, জুতা, পোশাক, প্রসাধনীসহ নানা ধরনের পণ্য দেখছেন। কেউ সরাসরি চীনা সরবরাহকারীদের সঙ্গে দরদাম করছেন, কেউ আবার পণ্য কেনার পাশাপাশি নতুন ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। পাইকারি পণ্যের বাজার হিসেবে সানইউয়ানলির পরিচিতি থাকায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কাছে এর গুরুত্বও বাড়ছে। কেনাকাটার পাশাপাশি এখানে প্রবাসীদের মধ্যে পরিচিতি, অভিজ্ঞতা ও ব্যবসায়িক তথ্য বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
দেশীয় খাবারে ঘুচে প্রবাসের দূরত্ব
সানইউয়ানলির পরিচিত বাংলাদেশি খাবারের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম হ্যালো বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট। বাংলাদেশি নাগরিক রাজা ও চীনা নাগরিক মাসুদের পরিচালনায় রেস্টুরেন্টটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। গুয়াংজুতে আসা অনেক বাংলাদেশিই দুপুর কিংবা রাতের খাবারের জন্য এখানে ছুটে আসেন।
রেস্টুরেন্টটির মালিক রাজা বলেন, বিদেশে দীর্ঘদিন থাকলে স্বাভাবিকভাবেই নিজের দেশের খাবারের প্রতি আলাদা আকর্ষণ তৈরি হয়। বিশেষ করে ব্যবসায়িক কাজে চীনে আসা বাংলাদেশিরা দেশীয় খাবারের পাশাপাশি বাংলায় কথা বলা, পরিচিত পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানো এবং প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময়ের সুযোগ খোঁজেন। হ্যালো বাংলাদেশে এসে তারা সেই সুযোগ পান।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে বাংলাদেশি খাবারের চাহিদা রয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনায় নানা চ্যালেঞ্জও আছে। দোকানভাড়া, কর্মীদের বেতনসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয় নিয়মিত মেটাতে হয়। তারপরও বাংলাদেশিদের কাছে দেশীয় খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
ক্যান্টন ফেয়ারে অংশ নিতে মালয়েশিয়া থেকে চীনে এসেছেন বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বাসিন্দা মো. মনিরুল ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় বসবাস করছেন তিনি। চীনে এসে স্থানীয় খাবারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে দেশীয় খাবারের খোঁজে সন্ধ্যায় চলে আসেন হ্যালো বাংলাদেশ রেস্টুরেন্টে।
মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘চীনে আসার পর থেকে এখানকার খাবার খুব একটা খেতে পারছি না। তাই দেশীয় খাবারের খোঁজে এখানে এসেছি। রেস্টুরেন্টে এসে মনে হচ্ছে নিজের শহরে, নিজের দেশেই আছি। পরিচিত অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। সত্যিই চীনের বুকে একখণ্ড বাংলাদেশ।’
আহমাদুল কবির, জুয়াংজু (চীন) থেকে:মালয়েশিয়ায় নয় বছর ধরে বসবাসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ার বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টগুলোর তুলনায় এখানকার রেস্টুরেন্টে খাবারের মান আমার কাছে ভালো মনে হয়েছে।’
তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন মালয়েশিয়া প্রবাসী সিলেটের এনাম আহমদ ইমাম। তিনিও ক্যান্টন ফেয়ারে অংশ নিতে চীনে এসেছেন। সানইউয়ানলিতে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট ও খাবারের পরিবেশের প্রশংসা করেন তিনি।
সানইউয়ানলির একটি হোটেলে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাংলাদেশি প্রবাসী বলেন, গুয়াংজুতে বসবাসরত হাজার হাজার বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীর যাতায়াতের অন্যতম কেন্দ্র এই এলাকা। এখানে বাংলাদেশি ও হালাল খাবারের রেস্টুরেন্ট থাকায় বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ ছুটে আসেন।
তিনি বলেন, ‘ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির দেশে বসবাস করতে গিয়ে মানুষ নিজের দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতিকে খুব বেশি অনুভব করেন। এখানে এসে বাংলায় কথা বলা যায়, পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, দেশীয় খাবার পাওয়া যায়। কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও মনে হয় দেশের পরিবেশে ফিরে এসেছি।’
তার মতে, শুধু খাবার কিংবা আড্ডাই নয়, সানইউয়ানলির অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। ব্যাগ, জুতা, পোশাক, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্যের বড় বাজার থাকায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা এখানে কেনাকাটা করতে আসেন। অনেকে এখান থেকে পণ্য সংগ্রহ করে নিজ দেশে পাঠান।
সব মিলিয়ে সানইউয়ানলি এখন শুধু বাংলাদেশি খাবার কিংবা পণ্যের বাজার নয়; চীনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সামাজিক যোগাযোগ, ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। হাজার মাইল দূরে থেকেও মাতৃভাষা, দেশীয় খাবার আর পরিচিত মানুষের সান্নিধ্যে এখানে যেন কিছুক্ষণের জন্য ফিরে পাওয়া যায় বাংলাদেশকে।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button