জলবায়ু পরিবর্তন

কপ৩১-এ জলবায়ু অর্থায়ন ও ন্যায্য উত্তরণের দাবিতে সরব গ্লোবাল সাউথ, উন্নত দেশগুলিকে দায় পূরণের আহ্বান

কপ৩১-এ জলবায়ু অর্থায়ন ও ন্যায্য উত্তরণের দাবিতে সরব গ্লোবাল সাউথ, উন্নত দেশগুলিকে দায় পূরণের আহ্বানআগামী দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক আলোচনা কোন পথে এগোবে, তার গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠতে চলেছে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে জলবায়ু অর্থায়ন, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে বিরোধ। এই প্রেক্ষাপটে গ্লোবাল ক্যাম্পেন টু ডিমান্ড ক্লাইমেট জাস্টিসের (ডিসিজে) আয়োজিত এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক সমাজের বিশেষজ্ঞরা তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য কপ৩১ জলবায়ু সম্মেলনে গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ ও দাবিগুলি তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ঐতিহাসিকভাবে দায়ী উন্নত দেশগুলিকে প্রথমে এবং দ্রুততম গতিতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলিকে প্রয়োজনীয় অর্থ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধির সহায়তা দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি অভিঘাত যাঁদের জীবনে পড়ছে, সেই প্রান্তিক ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীর অধিকার, অভিজ্ঞতা এবং দাবিকেও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে রাখতে হবে।

থার্ড ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্কের মীনা রমন জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্নে উন্নত দেশগুলির দায়বদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন কোনও দয়া বা উন্নয়ন সহায়তা নয়, এটি একটি বাধ্যবাধকতা। উন্নত দেশগুলির ঐতিহাসিক দায়ের ভিত্তিতেই উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতি তাদের জলবায়ু ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় অর্থ দিতে গ্লোবাল নর্থের দেশগুলির রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। ফলে কপ৩১-এ জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে বড় ধরনের বিরোধের আশঙ্কা রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলির বক্তব্য, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় তাদের বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হলেও ঐতিহাসিকভাবে বেশি নিঃসরণের জন্য দায়ী দেশগুলি সেই ব্যয়ের যথাযথ অংশ বহন করতে চাইছে না।

এশিয়ান পিপলস মুভমেন্ট অন ডেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এপিএমডিডি) চাদলি সাদোররা ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য, মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া ন্যায্য উত্তরণ সম্ভব নয়। প্রস্তাবিত বেলেম-আন্তালিয়া মেকানিজমের (বিএএম) মাধ্যমে বিশ্ব, জাতীয় ও স্থানীয়—প্রতিটি স্তরে মানুষ যাতে ন্যায্য উত্তরণের নীতি নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নে অংশ নিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য রাষ্ট্রসংঘের জলবায়ু প্রক্রিয়ায় পর্যবেক্ষকের মর্যাদা পাওয়া বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং অধিকারভিত্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ ইন্টারন্যাশনালের কীর্তনা চন্দ্রশেখরন বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন ও তথ্যপ্রযুক্তি পরিকাঠামোর সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া জ্বালানি নীতির সীমাবদ্ধতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর মতে, কেবল বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ালেই কার্বন নিঃসরণ কমবে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে কিংবা সকলের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। এর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তার সুফল সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছয় এবং পরিবেশগত ক্ষতি কমে।

কীর্তনার বক্তব্য, বর্তমানে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর নামে উন্নয়নশীল দেশ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ বোঝা চাপানো হচ্ছে। তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের বাড়তে থাকা চাহিদা মেটাতে একদিকে খনিজ উত্তোলন বাড়ছে, অন্যদিকে জমি দখল এবং জীবাশ্ম জ্বালানির আরও সম্প্রসারণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এর ফলে যাঁরা ইতিমধ্যেই পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার, তাঁদের জীবন ও জীবিকার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতায়নের পক্ষে সওয়াল করে বলেন, জ্বালানি নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রত্যেক মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা।

গ্লোবাল ফরেস্ট কোয়ালিশনের কোয়ামি কপন্ডজো কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ বা কার্বন ডাই-অক্সাইড রিমুভাল (সিডিআর) প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নিয়ে সতর্ক করেন। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্য পূরণের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলিকে তাদের জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনায় এই ধরনের প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। এর মধ্যে রয়েছে বায়োচার, কার্বন ধরে রাখা ও সংরক্ষণ, কার্বন ধরে রাখার ব্যবস্থাসহ জৈবশক্তি উৎপাদন এবং সামুদ্রিক পরিবেশ থেকে কার্বন অপসারণের বিভিন্ন পদ্ধতি।

কপন্ডজোর মতে, বিশেষ করে আফ্রিকা-সহ গ্লোবাল সাউথের দেশগুলিতে বায়োচার ও কার্বন ধরে রাখার ব্যবস্থাসহ জৈবশক্তি উৎপাদনের প্রকল্প সম্প্রসারিত হলে বৃহৎ আকারে জমি অধিগ্রহণ ও দখলের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এসব প্রকল্পের জন্য গাছ এবং অন্যান্য জৈব পদার্থ উৎপাদন করতে বিপুল পরিমাণ জমির প্রয়োজন হয়। পরে সেই গাছপালা ও জৈব পদার্থ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা হয়। এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে তাদের বসতভিটে ও জীবিকার জমি থেকে উচ্ছেদ করা হতে পারে এবং জমির অধিকার নিয়ে সংঘাত বাড়তে পারে। তাঁর বক্তব্য, জলবায়ু সংকট মোকাবিলার নামে এমন কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা গ্রহণযোগ্য নয়, যা আবার নতুন করে মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও জীবিকার সংকট সৃষ্টি করে।

গ্লোবাল ক্যাম্পেন টু ডিমান্ড ক্লাইমেট জাস্টিসের রচিত গুপ্ত বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনা কোনও বিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; এর সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের সম্মুখীন জনগোষ্ঠীর জীবনে। তাই কপ৩১-এ নেওয়া সিদ্ধান্তগুলিকে অবশ্যই এই জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দাবির ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। তাঁর মতে, জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী অর্থনৈতিক মডেলগুলিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো প্রয়োজন। যাঁরা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির সবচেয়ে বেশি শিকার, তাঁদেরই নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রে রাখতে হবে।

রচিতার বক্তব্যে গাজার প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি ইজরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং গাজায় গণহত্যাকে জ্বালানি জোগাচ্ছে বলে তিনি যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলগুলিকে দায়ী করেন, সেগুলি ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলিকে তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব স্বীকার করে অন্যদের আগে এবং দ্রুততম গতিতে নিঃসরণ কমাতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলিকে এই প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় অর্থ, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়তাও দিতে হবে।

গ্লোবাল ক্যাম্পেন টু ডিমান্ড ক্লাইমেট জাস্টিসের ভিক্টর মেনোত্তি উন্নত দেশগুলির জলবায়ু অর্থায়ন এবং সামরিক ব্যয়ের মধ্যে বৈপরীত্যের কথা তুলে ধরেন। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে অবদান এবং অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক জলবায়ু অর্থায়ন কমাচ্ছে, অথচ সামরিকীকরণে ব্যয় বাড়াচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী অ্যানেক্স-১ ভুক্ত দেশগুলির একাংশ এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন ও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং তার ব্যবহারেও ভর্তুকি দিচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মেনোত্তির আরও অভিযোগ, ধনীদের জন্য করছাড় দেওয়া হলেও বড় তেল ও জীবাশ্ম জ্বালানি সংস্থাগুলির বিপুল অতিরিক্ত মুনাফার ওপর যথাযথ কর আরোপ করা হচ্ছে না। ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেও এই সংস্থাগুলি মুনাফা করছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, জলবায়ু অর্থায়নের ঘাটতি দূর করার প্রশ্নে উন্নত দেশগুলির সরকারি ব্যয়, করনীতি এবং জীবাশ্ম জ্বালানি সংস্থাগুলির প্রতি তাদের নীতিগত অবস্থানকে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ডিসিজে-র এই সংবাদ সম্মেলনের মূল বক্তব্য, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় শুধু নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করলেই চলবে না। সেই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দায় কারা বহন করবে, জ্বালানি রূপান্তরের সুফল কারা পাবে এবং এর জন্য জমি, বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর কার অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে—এই প্রশ্নগুলিরও সমাধান প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলির ঐতিহাসিক দায়, উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থায়নের প্রয়োজন এবং জলবায়ু বিপর্যয়ের সম্মুখীন জনগোষ্ঠীর অধিকারকে কেন্দ্র করে কপ৩১-এ আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এমন এক রূপান্তর প্রয়োজন, যা একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাবে, অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর নতুন অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং সামাজিক বোঝা চাপাবে না। কপ৩১-এ এই দাবিগুলি কতটা গুরুত্ব পায়, তা নির্ভর করবে জলবায়ু অর্থায়ন, নিঃসরণ হ্রাস এবং ন্যায্য উত্তরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় দেশগুলি কী ধরনের বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তার ওপর।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button