বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এক অনন্য সাধারণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, এই নির্বাচন ও গণভোট তারই একটি চূড়ান্ত প্রতিফলন। এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তথ্য অনুযায়ী, ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন ভোটার এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করছেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১,২২০ জন।দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর এটিই হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, যেখানে ৫১টি রাজনৈতিক দল এবং ২,০৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে এবারের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। গণভোট ও সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ৫৪০ জন বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে পৌঁছেছেন। ভোটের ময়দানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যারা সর্বোচ্চ ২৯১ জন প্রার্থী দিয়েছে। এর পরেই রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (২৫৮ জন প্রার্থী) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (২২৯ জন প্রার্থী)। নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জাতীয় নাগরিক দল (এনসিপি) ৩২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এছাড়াও ২৭৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোটের লড়াইয়ে সামিল হয়েছেন। তবে ভোটার সংখ্যার দিক থেকে গাজীপুর-২ আসনটি দেশের বৃহত্তম (৮,০৪,৩৩৩ ভোটার) এবং ঝালকাঠি-১ আসনটি ক্ষুদ্রতম (২,২৮,৪৩১ ভোটার) হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এবারের নির্বাচনের অন্যতম বিশেষত্ব হলো প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য প্রথমবারের মতো চালু হওয়া পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা। কেবল প্রতিনিধি নির্বাচনই শেষ কথা নয়; একই দিনে ভোটারদের হাতে তুলে দেওয়া গোলাপি ব্যালট বা গণভোটের গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়।
এই গণভোটের মাধ্যমে নাগরিকরা সরাসরি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা কেমন সংবিধানে শাসিত হতে চান। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই ভোটে ভোটাররা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো ৩০টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবের ওপর ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ রায় দেবেন। পরিসংখ্যান বলছে, মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশই হলো তরুণ প্রজন্ম (১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী), যাদের প্রায় ৫০ লাখ প্রথমবার ভোট দেবেন। এই ‘জেন-জি’ ভোটারদের রায়ই মূলত নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামীর রাজনৈতিক গতিপথ।তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ৩০০টি আসনের পরিবর্তে ২৯৯টি আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পাশাপাশি নারী প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম (মাত্র ৪ শতাংশের কাছাকাছি) হওয়া এবং নির্বাচনের আগে বিক্ষিপ্ত সহিংসতার ঘটনা পর্যবেক্ষকদের চিন্তায় রাখছে। তবুও ৫৯.৫ শতাংশ নাগরিক গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় দিতে পারেন বলে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে উঠে এসেছে।
সর্বোপরি, এই নির্বাচন ও গণভোট সফল হওয়া মানে কেবল একটি নতুন সরকার গঠন নয়, বরং এটি হবে জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তে ভেজা ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। ১২ ফেব্রুয়ারির ফলাফলই বলে দেবে বাংলাদেশ কি তার পুরনো বৃত্তে ঘুরপাক খাবে, নাকি একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে।তবে এই নির্বাচনের একটি অন্ধকার দিক হয়ে দাঁড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যে প্রচার বা ‘ডিস-ইনফরমেশন’-এর ভয়াবহ প্লাবন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বয়ং গত ১৩ জানুয়ারি রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার প্রধানের সঙ্গে ফোনালাপে এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নির্বাচনী বিশ্লেষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি করা ‘ডিপফেক’ ভিডিও এবং ভুয়া খবর এখন নির্বাচনের সবচেয়ে বড় হুমকি। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কেবল একটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেই (X) বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে অন্তত ৭ লাখ ভুয়া পোস্ট করা হয়েছে, যার ৯০ শতাংশই বিদেশের মাটি থেকে পরিচালিত।
বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়াতে পারে এমন অন্তত ১৭০,০০০ ভুয়া অ্যাকাউন্টের হদিশ পাওয়া গেছে, যা সমাজে দাঙ্গা বা অস্থিরতা তৈরির জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে এই মিথ্যা প্রচারের ফলে জনমনে এক ধরণের আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ভোটারই মনে করছেন, ভোটের দিন বা তার ঠিক আগে কোনো ভুয়া ভিডিও বা খবর ছড়িয়ে বড় ধরণের সহিংসতা উস্কে দেওয়া হতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই মেটা ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং ক্ষতিকর কন্টেন্ট সরিয়ে ফেলতে বিশেষ ইউনিট গঠন করেছে।
এআই-জেনারেটেড ভিডিওর মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের বিকৃত ভাষণ বা সংখ্যালঘু নির্যাতনের ভুয়া পরিসংখ্যান ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ে খেলার চেষ্টা চলছে বলে গোয়েন্দা রিপোর্টেও উল্লেখ করা হয়েছে। ১২ কোটির বেশি ভোটারের এই বিশাল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল লিটারেসির অভাব একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ অনেকেই তথ্য যাচাই না করেই এই সব গুজব শেয়ার করছেন।১২ ফেব্রুয়ারির ফলাফল কেবল নতুন সরকারই দেবে না, বরং সেটি হবে তথ্যের সত্যতা বনাম ডিজিটাল অপপ্রচারের লড়াইয়ে বাংলাদেশের জয় বা পরাজয়ের মাপকাঠি।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, নয়াদিল্লি (ভারত)



