যুক্তরাজ্যে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে ১৩ বছরের ব্রিটিশ-বাঙালি বালক আহমেদ ইকবাল উল্লাহ
আহমেদ ইকবাল উল্লাহ হত্যার ৪০ বছর: বর্ণবাদ ও উগ্র ডানপন্থার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান
যুক্তরাজ্যে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে আহমেদ ইকবাল উল্লাহর হত্যাকাণ্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মর্মান্তিক ঘটনা। ১৯৮৬ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বর্ণবাদী হামলায় প্রাণ হারানো এই ব্রিটিশ-বাঙালি কিশোরের স্মরণে ঘটনার ৪০ বছর পর আবারও বর্ণবাদ ও উগ্র ডানপন্থার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীরা।
১৯৮৬ সালে দক্ষিণ ম্যানচেস্টারের বার্নেজ হাই স্কুলের খেলার মাঠে সহপাঠীদের বুলিং বা হয়রানি থেকে অন্য শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে গিয়ে বর্ণবাদী হামলার শিকার হয় আহমেদ। এক শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীর ছুরিকাঘাতে তার মৃত্যু হয়। হামলাকারীর বয়সও ছিল ১৩ বছর। পরবর্তীতে তাকে কিশোরদের জন্য প্রযোজ্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সমতুল্য সাজা দেওয়া হয়।
আহমেদের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি ছিল না; এটি যুক্তরাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্ণবাদ, বৈষম্য ও জাতিগত সহিংসতার বিষয়টিকেও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে আহমেদের গুরুত্ব
আহমেদের বোন সেলিনা উল্লাহর মতে, তার ভাইয়ের কাছে ব্রিটিশ মূল্যবোধের অর্থ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, দুর্বল মানুষের পাশে থাকা এবং জাতি বা বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সহযোগিতা করা। ভাইয়ের মৃত্যুর চার দশক পরও তিনি মনে করেন, আহমেদের এই আদর্শ বর্তমান সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
হত্যাকাণ্ডের পর ম্যানচেস্টারের বিদ্যালয়গুলোতে বর্ণবাদ ও জাতিগত সহিংসতার পরিস্থিতি তদন্তে ম্যাকডোনাল্ড তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্ণবাদ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা এবং বৈষম্যের সামাজিক প্রভাব বোঝানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তবে তৎকালীন শিক্ষা কর্তৃপক্ষ তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ গ্রহণে অনীহা দেখায় বলে সংশ্লিষ্ট আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন।
এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়, শুধু অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; বর্ণবাদী মনোভাবের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণগুলো চিহ্নিত করাও জরুরি।
স্মৃতি সংরক্ষণ ও গবেষণায় বিশেষ উদ্যোগ
আহমেদের স্মৃতিকে ধারণ করে ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আহমেদ ইকবাল উল্লাহ রেস সেন্টার (AIU RACE Centre)। ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লু কুশনিক এবং শিক্ষক জ্যাকি ওল্ডের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন, কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, অভিবাসন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সামাজিক সংগ্রামের তথ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
কেন্দ্রটি গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকর্মীদের জন্য ঐতিহাসিক নথি ও শিক্ষামূলক উপকরণ সরবরাহ করে। এর মাধ্যমে এমন অনেক মানুষের ইতিহাস সামনে আনা সম্ভব হচ্ছে, যাঁদের অবদান প্রচলিত ইতিহাসচর্চায় যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতিহাস সংরক্ষণ শুধু অতীতকে স্মরণ করার বিষয় নয়; বরং বর্তমানের বৈষম্য বুঝতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে বহুজাতিক ঐক্যের প্রয়োজন
আহমেদের মৃত্যুর ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় বিভিন্ন প্রজন্মের বর্ণবাদবিরোধী কর্মীরা অংশ নেন। সেখানে বর্ণবাদে আক্রান্ত বিভিন্ন জাতিগত ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
একসময় ‘পলিটিক্যাল ব্ল্যাকনেস’ ধারণাটি বিভিন্ন বর্ণবাদ-অভিজ্ঞ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক সংহতি গড়ে তোলার একটি কাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ এশীয়, আফ্রিকান এবং অন্যান্য বৈষম্যের শিকার সম্প্রদায়ের মানুষকে অভিন্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে একত্র করা। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা ও পরিচয়ের কারণে ধারণাটি সমালোচনার মুখে পড়ে।
তবে বর্তমান সময়ে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান এবং বর্ণবাদী বিদ্বেষ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই ঐক্যের ধারণাকে নতুনভাবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন কর্মীরা।
ম্যানচেস্টারের বর্ণবাদবিরোধী সংগঠন কিডস অব কালারের যুবকর্মী জারা মানোহেটোয়ে বলেন, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অভিজ্ঞতা আলাদা হলেও বর্ণবাদ তাদের জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। পরিবার, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির মধ্য দিয়েও তরুণদের মধ্যে এসব অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়।
লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা তারিক মাহমুদও তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকে শুধু অনলাইন আলোচনা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ, সংগঠন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
ম্যাকডোনাল্ড তদন্তের সঙ্গে যুক্ত অধ্যাপক গাস জন স্মরণসভায় বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান প্রদান করা নয়; শিক্ষার্থীদের বর্ণবাদ কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখতে পারে, তা বোঝানোও জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও এই বক্তব্যের গুরুত্ব রয়েছে। স্মরণসভায় অংশ নেওয়া শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীরা জানান, উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শের বিস্তার তরুণদের মধ্যে ভয়, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমালোচনামূলক চিন্তা, ইতিহাসচর্চা, যুক্তিনির্ভর আলোচনা এবং তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বর্ণবাদবিরোধী শিক্ষামূলক কর্মসূচি, কমিউনিটিভিত্তিক বিদ্যালয় এবং যুব উন্নয়ন উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
ব্যক্তিগত বেদনা থেকে সামাজিক পরিবর্তনের প্রেরণা
আহমেদের সহপাঠী নাইম স্মরণসভায় জানান, বন্ধুকে হারানোর পর তাঁরা প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা পাননি। সেই সময়ের শোক ও অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরে তিনি নিজের জীবন পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও আহমেদের স্মৃতি তাঁর মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে।
অন্যদিকে, আহমেদের চেয়ে এক বছরের বড় সহপাঠী পারভেজ ইকবাল এই মর্মান্তিক ঘটনাকে জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার প্রেরণা হিসেবে দেখেন। তিনি পড়াশোনা করে শিক্ষক হন এবং দীর্ঘ ২৩ বছর বার্নেজ স্কুলেই শিক্ষকতা করেন।
পারভেজের মতে, শিক্ষা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারে এবং বিদ্যালয় ও সমাজ সম্মিলিতভাবে কাজ করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
তাঁর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে আসে—শিশুদের শুধু শিক্ষিত করলেই হবে না, তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস গড়ে তুলতে হবে।
যুক্তরাজ্যে বিদ্বেষমূলক অপরাধের উদ্বেগজনক চিত্র
যুক্তরাজ্যে বর্ণবাদ ও ধর্মীয় বিদ্বেষের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া বছরে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে পুলিশ ১ লাখ ৪৬ হাজার ৮২৫টি বিদ্বেষমূলক অপরাধ নথিভুক্ত করেছে। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ৭ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে মুসলিমদের লক্ষ্য করে সংঘটিত বিদ্বেষমূলক অপরাধের সংখ্যা ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ৪৭৯টি থেকে ৫ হাজার ১৩২টিতে পৌঁছেছে।
এই পরিসংখ্যান নির্দেশ করে, বর্ণবাদ ও ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রতিরোধে এখনো কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
উপসংহার
আহমেদ ইকবাল উল্লাহর হত্যাকাণ্ডের ৪০ বছর পরও তাঁর স্মৃতি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা। তাঁর জীবন ও মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং দুর্বল মানুষের পাশে থাকা মানবিক দায়িত্বের অংশ।
বর্ণবাদ, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির বিস্তার রোধ করতে হলে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্যবিরোধী চর্চা জোরদার করা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সংহতি গড়ে তোলা জরুরি।
আহমেদের স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা শুধু তাঁকে স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় নিহিত, যেখানে কোনো শিশু তার বর্ণ, ধর্ম বা পরিচয়ের কারণে সহিংসতার শিকার হবে না। ন্যায়বিচার, শিক্ষা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মিলিত প্রতিরোধের মাধ্যমেই সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।



