প্রযুক্তিহাইলাইটস

চীনা উৎপাদকদের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসার সুযোগ পাচ্ছেন বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা

প্রযুক্তির মহাসমারোহে চীনের ক্যান্টন ফেয়ার

চীনা উৎপাদকদের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসার সুযোগ পাচ্ছেন বাংলাদেশি উদ্যোক্তারাবিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা চীনের ক্যান্টন ফেয়ারে এবার চোখে পড়ার মতো উপস্থিতি বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী এবং তরুণ উদ্যোক্তারা শুধু পণ্য দেখতে নয়, বরং চীনা উৎপাদকদের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলা, নতুন পণ্য সংগ্রহ এবং দেশের বাজারে ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে অংশ নিচ্ছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন উদ্ভাবনের এই বিশাল আয়োজনে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ যেন বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।
চীনের গুয়াংদং প্রদেশের গুয়াংজু শহরে গত ১৫ অক্টোবর শুরু হয়েছে ‘চায়না ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ফেয়ার’-এর ১৪০তম আসর। বিশ্বব্যাপী ক্যান্টন ফেয়ার নামে পরিচিত শতবর্ষী এই মেলা চলবে আগামী ৪ নভেম্বর পর্যন্ত। ১৯৫৭ সাল থেকে প্রতিবছর বসন্ত ও শরৎকালে দুবার এ মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও গুয়াংডং প্রাদেশিক সরকারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ মেলা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
সরেজমিনে মেলা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি প্রদর্শনী হলেই বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের আনাগোনা। বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস, গৃহস্থালি পণ্য, শিল্পযন্ত্রপাতি, কৃষি সরঞ্জাম, সৌরবিদ্যুৎ, নতুন জ্বালানিচালিত যানবাহন, রোবট প্রযুক্তি এবং স্মার্ট যন্ত্রপাতির প্রতি বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বেশি। কেউ খুঁজছেন দেশের বাজারে নতুন পণ্য আনার সুযোগ, কেউ আবার বিদ্যমান ব্যবসার জন্য কম খরচে উন্নত প্রযুক্তি ও পণ্যের উৎস সন্ধান করছেন।
বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্যান্টন ফেয়ারে অংশগ্রহণের অন্যতম বড় সুবিধা হলো চীনা উৎপাদকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই পণ্যের মান, উৎপাদন সক্ষমতা, দাম, ন্যূনতম অর্ডারের পরিমাণ, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা যাচ্ছে। পাশাপাশি এক জায়গায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্য তুলনা করে ব্যবসার জন্য উপযোগী পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন তারা।
তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছেও মেলাটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। বিশেষ করে যারা বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদের জন্য বিভিন্ন দেশের বাজারে জনপ্রিয় পণ্য, আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতি এবং ব্যবসার নতুন ধারণা সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই ভবিষ্যতে নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তোলা, চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি এবং দেশে পণ্য বাজারজাত করার পরিকল্পনা করছেন।
মেলায় আসা কুমিল্লার তরুণ উদ্যোক্তা উজ্জ্বল বলেন, ‘এই প্রথম ক্যান্টন ফেয়ারে এসেছি। এখানে এসে বুঝতে পারছি, ব্যবসার সম্ভাবনা কতটা বিস্তৃত। যত ঘুরছি, ততই নতুন নতুন পণ্য ও ব্যবসায়িক ধারণা পাচ্ছি। বাংলাদেশে কোন পণ্যের চাহিদা তৈরি হতে পারে, সেগুলো নিয়ে ভাবছি।’
সিলেটের ব্যবসায়ী সায়েম বলেন, ‘আমার মূল ব্যবসা ইলেকট্রনিক পণ্য নিয়ে। তিনিও প্রথমবারের মতো এই মেলায় এসেছি। বিভিন্ন ধরনের পণ্য দেখছি এবং উৎপাদকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছি। এতে পণ্যের মান, দাম ও সরবরাহের বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। দেশে ফিরে এসব যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের মতে, এ ধরনের আন্তর্জাতিক মেলায় নিয়মিত অংশগ্রহণ দেশের আমদানি বাণিজ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। সরাসরি উৎপাদকের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে পণ্য সংগ্রহের খরচ কমানোর পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে নতুন পণ্য ও প্রযুক্তি দেশের বাজারে নিয়ে আসার মাধ্যমে ভোক্তাদের জন্য বিকল্প বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের মেলায় ২১৪টি দেশ ও অঞ্চলের পাঁচ লাখের বেশি ক্রেতার অংশগ্রহণের তথ্য রয়েছে। মেলাটি তিনটি পর্বে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথম পর্ব ১৫ থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। এতে গৃহস্থালি বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, ভোক্তা ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য, শিল্পযন্ত্রপাতি, কৃষি সরঞ্জাম, নতুন জ্বালানিচালিত যানবাহন, স্মার্ট মোবিলিটি, রোবট প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম প্রদর্শিত হয়।
দ্বিতীয় পর্ব ২৩ থেকে ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়। এ পর্বে আসবাবপত্র, গৃহসজ্জার সামগ্রী, নির্মাণ উপকরণ, স্যানিটারি পণ্য, রান্নাঘরের সরঞ্জাম, সিরামিক, কাচের পণ্য, উপহারসামগ্রী ও দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা পণ্য স্থান পায়।
তৃতীয় পর্ব শুরু হয়েছে ৩১ অক্টোবর, চলবে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত। এতে পোশাক, বস্ত্র, জুতা, ব্যাগ, খেলনা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য, মা ও শিশুর সামগ্রী, খাদ্যপণ্য এবং ক্রীড়া ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট পণ্য প্রদর্শিত হচ্ছে। এ পর্বেও বাংলাদেশি আমদানিকারকদের জন্য পোশাক, টেক্সটাইল, জুতা, ব্যাগ, খেলনা ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বের নামিদামি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নতুন উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি নিয়ে এই মেলায় অংশ নিচ্ছে। বিশেষ করে রোবট প্রযুক্তি, বুদ্ধিমান উৎপাদন ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং স্মার্ট যন্ত্রপাতি এবারের আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। এসব প্রযুক্তি বাংলাদেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতেও ভবিষ্যতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের কাছে ক্যান্টন ফেয়ারের গুরুত্ব তাই শুধু পণ্য আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রবণতা বোঝা, নতুন ব্যবসায়িক অংশীদার খুঁজে পাওয়া, উৎপাদন প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং দেশের বাজারে নতুন পণ্যের চাহিদা তৈরি সব মিলিয়ে এটি তাদের জন্য ব্যবসা সম্প্রসারণের একটি বড় ক্ষেত্র। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে পণ্যের মান যাচাই, আমদানি ব্যয়, শুল্কনীতি, বাজার চাহিদা ও সরবরাহব্যবস্থার বিষয়ে যথাযথ প্রস্তুতিও জরুরি।
প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদের মিলনমেলায় পরিণত হওয়া ক্যান্টন ফেয়ার এবারও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের বাড়তি আগ্রহ ও সরব উপস্থিতি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারলে এই মেলায় অর্জিত অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগ বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button