ডিজিটাল নিরাপত্তায় অভিভাবকদের সতর্কবার্তা: ৯ বছরের শিশুর ৮৭ হাজার পাউন্ড বিজ্ঞাপন ব্যয়
ডিজিটাল প্রযুক্তি ও অনলাইন মাধ্যম শিশুদের শিক্ষা, বিনোদন এবং সৃজনশীলতার বিকাশে নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে তা কখনো কখনো পরিবারকে বড় ধরনের আর্থিক ও মানসিক সমস্যার মুখে ফেলতে পারে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এ বিষয়ে অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নয় বছর বয়সী এক শিশু নিজের মাইনক্রাফটভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেলের দর্শক বাড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রায় ৮৭ হাজার পাউন্ড ব্যয় করেছে। এই বিপুল অর্থ খরচ করা হয়েছে ইউটিউবে বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিজ্ঞাপনের অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল তার বাবার প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে।
শিশুটির নাম মাইক এবং তার ইউটিউব চ্যানেলের নাম ‘মাইটি মাইক প্লেস’। নিজের পছন্দের ভিডিও গেম নিয়ে মজা করে ভিডিও তৈরি করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। কিন্তু ভিডিওগুলোতে আশানুরূপ দর্শক না আসায় সে হতাশ হয়ে পড়ে। ছেলেকে উৎসাহ দিতে তার বাবা ডেভ প্রথমে প্রায় ২০ ডলারের একটি ছোট বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান চালু করে দেন। এ সময় তিনি ছেলেকে বিজ্ঞাপনের জন্য অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ, কোন ধরনের দর্শকের কাছে বিজ্ঞাপন পৌঁছাবে তা নির্বাচন এবং বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করার পদ্ধতি দেখিয়ে দেন।
কিন্তু বাবা বুঝতে পারেননি যে, তিনি যে প্রক্রিয়াটি ছেলেকে শেখাচ্ছেন, সেটি পরবর্তীতে এত বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এর আগে একটি কেনাকাটার সময় ডেভ তার প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য একই গুগল অ্যাকাউন্টে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। ফলে পরবর্তীতে সেই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে মাইক নিজেই বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান তৈরি এবং অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম হয়।
শিশুটির চিন্তাভাবনাও ছিল অত্যন্ত সরল। তার ধারণা ছিল, বিজ্ঞাপনে যত বেশি অর্থ ব্যয় করা হবে, তত বেশি মানুষ তার ভিডিও দেখবে। সেই ধারণা থেকেই সে একের পর এক বিজ্ঞাপন চালু করতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যয়ের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮৭ হাজার পাউন্ডে। অর্থাৎ একটি ছোট বিনোদনমূলক উদ্যোগ একপর্যায়ে পরিবারের জন্য বিশাল আর্থিক সমস্যায় পরিণত হয়।
ডেভ পরে জানতে পারেন যে তার প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ড থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। বিষয়টি জানার পর তিনি উপলব্ধি করেন যে, অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা গুগল অ্যাকাউন্টে উন্মুক্ত রাখা এবং শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ বা অর্থ ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ না করা ছিল বড় ভুল। তিনি নিজের দায়িত্বও স্বীকার করেছেন।
ঘটনাটি জানার পর শিশুটি নিজের পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছে, ‘আমি তো এবার মহাবিপদে পড়েছি।’ কথাটি হয়তো শিশুর মুখে রসিকতার মতো শোনালেও এর পেছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। শিশুদের হাতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের অনলাইন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়গুলোও অভিভাবকদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই ঘটনা থেকে অভিভাবকদের বিশেষভাবে সতর্ক হওয়া দরকার। শিশুর ব্যবহৃত গুগল অ্যাকাউন্ট, ইউটিউব অ্যাকাউন্ট বা অন্য কোনো অনলাইন সেবার সঙ্গে ক্রেডিট কার্ড কিংবা অন্য কোনো অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা যুক্ত থাকলে তা নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। প্রয়োজন ছাড়া কোনো অ্যাকাউন্টে কার্ডের তথ্য সংরক্ষণ না করাই নিরাপদ। একই সঙ্গে শিশুদের ব্যবহৃত যন্ত্র ও অনলাইন অ্যাকাউন্টে অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রাখা এবং অর্থ ব্যয়ের নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা জরুরি।
শিশুদের শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করতে দেওয়া যথেষ্ট নয়; প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত দায়িত্ব ও ঝুঁকি সম্পর্কেও তাদের বয়স অনুযায়ী শিক্ষা দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে যে অনলাইনে কোনো বিজ্ঞাপন চালানো, কোনো সেবা কেনা কিংবা কোনো অর্থ ব্যয়ের আগে অবশ্যই অভিভাবকের অনুমতি নিতে হয়। একই সঙ্গে তাদের বুঝতে হবে যে অনলাইনে কোনো কাজকে সহজ বা খেলাচ্ছলে মনে হলেও তার সঙ্গে প্রকৃত অর্থের লেনদেন জড়িত থাকতে পারে।
বিশেষ করে শিশুদের বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পারিবারিক বা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক হিসাব যুক্ত না রাখাই নিরাপদ। কারণ শিশুরা সবসময় অর্থের প্রকৃত মূল্য এবং একটি ছোট সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য বড় পরিণতি বুঝতে সক্ষম হয় না। তাই শুধু শিশুকে দোষারোপ না করে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিবেশটি নিরাপদ রাখার দায়িত্বও অভিভাবকদের নিতে হবে।
বর্তমান সময়ে শিশুদের অনলাইন জগৎ থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা সম্ভবও নয়, প্রয়োজনীয়ও নয়। বরং তাদের নিরাপদভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের নিয়মিত সন্তানের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
নয় বছর বয়সী একটি শিশুর ইউটিউব চ্যানেলের দর্শক বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা থেকে প্রায় ৮৭ হাজার পাউন্ড ব্যয়ের এই ঘটনা তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ডিজিটাল যুগে অভিভাবকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। প্রযুক্তি শিশুদের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারে, কিন্তু যথাযথ নজরদারি ছাড়া সেই প্রযুক্তিই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাধীনতার পাশাপাশি নিরাপত্তা, দায়িত্ববোধ এবং আর্থিক সচেতনতা নিশ্চিত করাও অভিভাবকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।



