ভ্রমণ

১৮৫ দেশ ভ্রমণের রেকর্ড গড়লেন নাজমুন নাহার

নাজমুন নাহারপ্রথম বাংলাদেশি এবং বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ১৮৫টি দেশ ভ্রমণের অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন নাজমুন নাহার। গত ৭ আগস্ট ভুটান সফরের মাধ্যমে তিনি ১৮৫তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক স্পর্শ করেন। বিশ্বভ্রমণের ২৬ বছরের দীর্ঘ অভিযাত্রায় নাজমুন নাহার ১ হাজার ২৯৪টিরও বেশি স্থানে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়েছেন। বিশ্বের সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, দুর্গম পাহাড়, মরুভূমি, সমুদ্র, মহাসাগর, দ্বীপাঞ্চল এবং অসংখ্য প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থানে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে ধরেছেন।

নাজমুন নাহারের ১৮৫ দেশ ভ্রমণের এই অসাধারণ অর্জনের পেছনে রয়েছে অসংখ্য সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা এবং জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ পেরিয়ে এগিয়ে চলার এক দুঃসাহসিক ইতিহাস। তিনি একজন সলো বিশ্বভ্রমণকারী। সড়কপথে তিনি বিশ্বের সব ল্যান্ডলকড দেশ ভ্রমণ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে দুর্গম সীমান্ত ও দীর্ঘ স্থলপথ অতিক্রম করেছেন। এ অভিযাত্রায় তিনি অগণিতবার জীবনঝুঁকি ও মৃত্যুর মুখোমুখি হলেও থেমে যাননি। সব অনিশ্চয়তাকে জয় করে একের পর এক দেশের সীমান্ত অতিক্রম করেছেন।

২০০০ সালে ভারতের একটি আন্তর্জাতিক অভিযাত্রা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বভ্রমণ শুরু করেন নাজমুন নাহার।

২০১৮ সালের ১ জুন জিম্বাবুয়ে সফরের মাধ্যমে তিনি ১০০তম দেশের মাইলফলক অর্জন করেন। এরপর ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর সাও টোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপে সফরের মাধ্যমে ১৫০তম, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভানুয়াতু সফরের মাধ্যমে ১৭৫তম এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাহামা সফরের মাধ্যমে ১৮৪তম দেশের মাইলফলক অর্জন করেন এই পরিব্রাজক।

ভ্রমণের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরছেন নাজমুন নাহার। পাশাপাশি শান্তি প্রতিষ্ঠা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বাল্যবিয়ে বন্ধের মতো সামাজিক বার্তা- ‘নো ওয়ার, অনলি পিস’, ‘সেভ দ্য প্ল্যানেট’ ও ‘স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ’ -প্রচারেও কাজ করছেন তিনি।

বিশ্বের শতাধিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্জন তুলে ধরেছেন নাজমুন। আন্তর্জাতিক মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবেও তিনি তরুণ প্রজন্মকে সাহস, নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস, মানবিক মূল্যবোধ ও স্বপ্নপূরণের জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন। আন্তর্জাতিক টেডএক্স প্ল্যাটফর্মেও বক্তব্য দিয়েছেন তিনি।

মানবিক কর্মকাণ্ডেও নাজমুন নাহারের ভূমিকা রয়েছে। তিনি বিভিন্ন সংগঠনের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছেন। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যভিত্তিক ২৬টি চ্যারিটি সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম ‘সাফার ফর পিস’র শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করেছেন। গাজাসহ বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের শিশুদের সহায়তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবিক কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণ ও মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশ-বিদেশে ৭০টিরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জন করেছেন নাজমুন নাহার। এর মধ্যে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মর্যাদাপূর্ণ ‘পিস টর্চ বিয়ারার অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারের কাছ থেকেও বিভিন্ন উপাধি ও বিশেষ সম্মাননা পেয়েছেন নাজমুন।

২০১৮ সালে জাম্বিয়া সরকার তাকে ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ উপাধিতে ভূষিত করে। ২০২৩ সালে সেন্ট লুসিয়ার প্রধানমন্ত্রী ফিলিপ জোসেফ পিয়ের তাকে ‘ব্রেভ গার্ল’ উপাধিতে সম্মানিত করেন। তার ব্যতিক্রমী অর্জন ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে সম্মাননা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।

নাজমুন নাহার বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ‘এশিয়ান স্টাডিজ’ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এশিয়া’ বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

ভুটান অভিযানের কথা উল্লেখ করে নাজমুন নাহার বলেন, ১৮৫তম দেশ ভ্রমণের অ্যাডভেঞ্চারে ভুটানের পাহাড়ি নৈসর্গিক দৃশ্য আমাকে নতুন করে বিস্মিত করেছে। ভুটান আমার জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারাস ভ্রমণ। পারো, থিম্পু, পুনাখা, ডোচুলা, বুমথাং, ফোবজিখা ও হা ভ্যালিতে ঘুরিয়েছি লাল-সবুজের পতাকা। প্রতিটি স্থানই অপূর্ব পাহাড়, হিমালয়ের পর্বতশ্রেণি, সবুজ উপত্যকা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা। ভুটান অসাধারণ ও বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির এক অপূর্ব নান্দনিক দেশ।

এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় নাজমুন নাহার বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, স্বাধীনতার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নারীশক্তিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন। সাহস, আত্মবিশ্বাস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বিশ্বের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

১৮৫ দেশে বিশ্বভ্রমণের মাধ্যমে নাজমুন নাহার একজন বাংলাদেশি নারীর সাহস, অধ্যবসায় ও নারী জাগরণের শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছেন। লাল-সবুজের পতাকা হাতে তার এই অভিযাত্রা আগামী প্রজন্মের জন্য সাহস, অধ্যবসায় ও স্বপ্নপূরণের এক অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button