গত বছর নভেম্বর মাসের একটি মনোরম ও কর্মব্যস্ত সময়ে আমাদের গন্তব্য ছিল দূর-দ্বীপবাসিনী লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল। বিশ্বজুড়ে উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট যখন পৃথিবীকে গ্রাস করে চলেছে, তখন এর পেছনের বৈশ্বিক নীতি ও কূটনীতি কাভার করার এক সুবর্ণ সুযোগ আমার সামনে এসে হাজির হয়েছিল। গণমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে এই গুরুত্বপূর্ণ কনফারেন্সে যোগদানের রোমাঞ্চই ছিল আলাদা। তবে এই সুদীর্ঘ যাত্রাকে আরও বেশি স্বস্তিদায়ক ও স্মৃতিময় করে তুলেছিল আফ্রিকান মহারথী—‘ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স’।
সুদূর আফ্রিকা হয়ে দক্ষিণ আমেরিকা পাড়ি জমানোর এই যাত্রাপথ কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া ছিল না; এটি ছিল এক অসাধারণ আতিথেয়তা ও বিশ্বমানের সেবার অনন্য অভিজ্ঞতা।
যাত্রা শুরু ও আদ্দিস আবাবার পথে:
ভ্রমণের দিনটিতে রোমাঞ্চ আর উত্তেজনার কমতি ছিল না। রাজধানী ঢাকা থেকে পেশাগত সরঞ্জামে ভারী ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে যখন বিমানে উঠলাম, তখন থেকেই শুরু হলো এই রোমাঞ্চকর অভিযানের প্রথম অধ্যায়। আমাদের ফ্লাইটটি প্রথমে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের প্রচলিত রুট এড়িয়ে সোজা ডালপালা মেলল পূর্ব আফ্রিকার আকাশসীমার দিকে। গন্তব্য—ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবার ঐতিহাসিক বোলে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
আকাশপথের দীর্ঘ এই যাত্রায় ক্লান্তি আসার কথা থাকলেও ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের আধুনিক ও প্রশস্ত ক্যাবিন ক্রুদের অমায়িক হাসি আর উষ্ণ অভ্যর্থনা সমস্ত ক্লান্তি নিমিষেই দূর করে দিয়েছিল। বিমানটিতে পা রাখার পর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, কেন এই এয়ারলাইন্সটিকে আফ্রিকান এভিয়েশনের ‘মুকুটহীন সম্রাট’ বলা হয়। সিটের বিন্যাস, পরিচ্ছন্নতা এবং যাত্রীদের প্রতি আন্তরিক যত্ন—সব কিছুতেই ছিল পেশাদারিত্বের এক সুউচ্চ মানদণ্ড।
বিশ্বমানের বিমানবালা ও ক্যাবিন সেবা:
একটি ফ্লাইটের দীর্ঘ সময়কে আনন্দময় করে তোলার ক্ষেত্রে ক্যাবিন ক্রু বা বিমানবালাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানবালাদের আন্তরিক আচরণ ও নিখুঁত সেবাশৈলী সত্যিই মুগ্ধ করার মতো ছিল। তাদের পরনে ছিল ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় তৈরি মার্জিত পোশাক, আর মুখে ছিল সবসময় এক আন্তরিক হাসির ঝিলিক।
যাত্রী মাত্রই তাদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেত। ফ্লাইটের কোনো যাত্রী সামান্য অস্বস্তিতে পড়লে কিংবা কোনো বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হলে, মুখে মৃদু হেসে—তারা তাৎক্ষণিকভাবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ভাষা বা সংস্কৃতির কোনো দূরত্বই তাদের পেশাদারিত্বের অন্তরায় হয়নি। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় তারা বারবার খোঁজ নিয়েছেন কোনো কিছুর প্রয়োজন আছে কি না। তাদের এই আন্তরিক ও মনস্তাত্ত্বিক সেবা যাত্রার সমস্ত ক্লান্তি ভুলিয়ে দিতে জাদুর মতো কাজ করেছিল। এর মধ্যেই এক পোষা প্রাণীর মিষ্টি চাহনি সবার নজর কাড়ে। দেখা গেল, আইএটিএ (আয়েটা) অনুমোদিত বিশেষ ট্রাভেল বক্স বা ক্রেট ব্যবহার করে এক যাত্রী একটি পার্সিয়ান বিড়াল পরিবহন করছেন। বাক্সের ভেতরে প্রাণীটি যেমন স্বাচ্ছন্দ্যে নড়াচড়া করতে পারছে, তেমনি পাশে বসা শিশুটির সাথে খুনসুটিতেও মেতে উঠছে। তাদের এই আনন্দময় মিতালি পুরো পরিবেশটিকে এক জাদুকরী ও মধুময় রূপ দিয়ে তোলে।
আকাশে মেঘের রাজ্যে বসে উন্নত মানের খাবার উপভোগ করার অভিজ্ঞতা সব সময় এক ভিন্নমাত্রা যোগ করে। ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের ক্যাটারিং সার্ভিস বা খাবার-দাবার ছিল এককথায় অতুলনীয় এবং বিশ্বমানের। উড্ডয়নের পরপরই যখন খাবারের ট্রলি নিয়ে ক্রুরা হাজির হলেন, তখন সুবাসে চারপাশ মোহিত হয়ে গেল।
খাবারের মেন্যুতে বৈচিত্র্য ও পুষ্টির এক অপূর্ব সমন্বয় ছিল। মহাদেশীয় বা কন্টিনেন্টাল খাবারের পাশাপাশি ইথিওপিয়ার নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পদের ছোঁয়াও ছিল বেশ চমৎকার। খাবারগুলো শুধু যে সুস্বাদু ছিল তা নয়, বরং এর পরিবেশন শৈলী ছিল অত্যন্ত নান্দনিক ও পরিপাটি।
এর পাশাপাশি পানীয় বা বেভারেজের আয়োজন ছিল রাজকীয়। বিশ্বখ্যাত ইথিওপিয়ান কফি—যার সুবাস ও গাঢ় স্বাদ কফিপ্রেমীদের সবসময় টানে—তা ফ্লাইটেও পরিবেশন করা হয়েছিল। একদম টাটকা ও খাঁটি সেই কফির সুবাসে পুরো বিমান ক্যাবিন যেন একমুহূর্তের জন্য সতেজ হয়ে উঠেছিল। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্রিমিয়াম ফ্রুট জুস, কোমল পানীয় এবং আন্তর্জাতিক মানের ওয়াইন ও মিনারেল ওয়াটারের পর্যাপ্ত ও উন্মুক্ত ব্যবস্থা ছিল, যা যাত্রীদের রুচি ও পছন্দকে পুরোপুরি প্রাধান্য দিয়েছিল।
আদ্দিস আবাবায় ট্রানজিট ও রাজকীয় হোটেলে রাত্রী যাপন:
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন আমরা ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় বোলে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম, তখন স্থানীয় সময় অনুযায়ী বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। ব্রাজিলের মূল ফ্লাইট ধরার আগে আমাদের যাত্রাবিরতি বা ট্রানজিট ছিল দীর্ঘ ১৫ ঘণ্টার। স্বাভাবিকভাবেই এত দীর্ঘ যাত্রার পর ট্রানজিট লাউঞ্জে সময় কাটানো বেশ কষ্টকর! তবে, ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের যাত্রীবান্ধব পলিসির সুবাদে এই ট্রানজিট অভিজ্ঞতা এক চমৎকার অবকাশযাপনে রূপ নিল।
এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকেই ট্রানজিট যাত্রীদের জন্য আদ্দিস আবাবার একটি নামী ও অভিজাত হোটেলে একরাত বিনামূল্যে যাপনের সুব্যবস্থা করা হলো। বিমানবন্দর থেকে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে এয়ারলাইন্সের নির্ধারিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শাটল বাসে করে যখন হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, তখন বাইরের আফ্রিকান শহরের রাতের স্নিগ্ধ রূপ চোখে পড়ল।
হোটেলটিতে পৌঁছানোর পর চেক-ইন প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত দ্রুত ও ঝঞ্ঝামুক্ত। রিসেপশন থেকে শুরু করে রুম পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে স্টাফদের আন্তরিকতা লক্ষ্য করার মতো ছিল। হোটেলের ঘরটি ছিল বিশাল, অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, এবং আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধায় ভরপুর। নরম ও আরামদায়ক বিছানা দেখে দীর্ঘপথের ক্লান্তি যেন এক নিমিষেই দূর হয়ে গেল।
সে রাতের ডিনারটি হোটেল কর্তৃপক্ষ বুফে সিস্টেমে আয়োজন করেছিল, যেখানে আফ্রিকান, মিডল ইস্টার্ন এবং কন্টিনেন্টাল—সব ধরনের খাবারের বিশাল সমাহার ছিল। উষ্ণ আতিথেয়তা আর সুস্বাদু খাবারের পর সেই গভীর রাতে দীর্ঘ সময় ধরে একপ্রস্থ ঘুম দিয়ে শরীর পুরোপুরি চাঙ্গা করে নিয়েছিলাম।
পরদিন সকালে ইথিওপিয়ার ঐতিহ্যবাহী ব্রেকফাস্ট সেরে যখন ফের বিমানে উঠলাম, আদ্দিস আবাবা থেকে বিমান আকাশে ডানা মেলতেই হৃদয়ে শিহরণ জাগল। দীর্ঘ এই আকাশযাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত যেন রোমাঞ্চে ভরপুর। ইথিওপিয়ার মাটি ছেড়ে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে চলা মেঘের রাজ্য পেরিয়ে অবশেষে ব্রাজিলের আকাশ ছোঁয়া। দীর্ঘ ট্রানজিট আর ক্লান্তি দূর হয়ে গেল যখন জানালা দিয়ে নিচে সাও পাওলোর অপরূপ আলোর ঝলকানি চোখে পড়ল। বিমানটি যখন টার্মিনালে অবতরণ করল, তখন এক নতুন বিশ্বের হাতছানি আমাকে স্বাগত জানাল। ইথিওপিয়ার সংস্কৃতি থেকে একেবারে ভিন্ন এক লাতিন আবহাওয়ায় পা রাখলাম। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে স্বপ্নের শহর সাও পাওলোতে এসে পৌঁছানোর এই অনুভূতি সত্যিই অবিশ্বাস্য ও রোমাঞ্চকর।





