জেলার খবরহাইলাইটস

বগুড়ায় একদিনের মেলায় শুধু কটকটি বিক্রি হয়েছে প্রায় পৌনে ৫ কোটি টাকার

kotkotiশত বছরের ঐতিহাসিক বগুড়ার মহাস্থান গড়ের বৈশাখের শেষ বৃহস্পতিবার একদিনের সাধু সন্ন্যাসিদের মেলায় শুধু কটকটি বিক্রি হয়েছে প্রায় পৌনে ৫ কোটি টাকা। বগুড়ার মহাস্থানগড় এলাকার কটকটি ব্যবসায়িরা বলছেন, গত কয়েক বছরের চেয়ে এ বছর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে কটকটি। প্রায় দুই শতাধিক দোকান থেকে একদিনে কটকটি বিক্রি হয়েছে প্রায় ৬ হাজার মনেরও বেশি। এই পরিমান কটকটির বাজার দর হিসেব দাম দাঁড়ায় প্রায় পৌনে ৫ কোটি টাকা।

ইতিহাসে কথিত আছে, প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসখ্যাত মহাস্থানগড়ের তৎকালিন সময়ের রাজা পরশুরামকে যুদ্ধে পরাজিত করেন ইসলাম ধর্ম প্রচারক ও আধ্যাতিক সুফি সাধাক হযরত শাহ্ সুলতান মাহমুদ বলখী (রহ.)। তিনি বাংলায় এসেছিলেন আফগানিস্তান থেকে। ১৪’শ শতাব্দিতে পরশুরামকে পরাজিত করে তিনি বিজয়ী হয়ে পুন্ড্রনগর তথা মহাস্থান এলাকায় ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন। যুদ্ধে পরশুরাম নিহত হন। ধর্মপ্রচার করতে করতে তিনি এলাকায় গ্রহণযোগ্য ও তার অসংখ্য অনুসারি হয়ে উঠেন। পরে তিনি সেখানেই বসবাস করাকালে ইন্তেকাল করেন। তবে কোথাও কোথাও বলা হয় ১০৪৩ খ্রীস্টাব্দে তিনি বাংলায় আসেন এবং ১০৪৯ খ্রী: তিনি ইন্তেকাল করেন। এই সাল উল্লেখ থাকলেও সঠিক তথ্য কেউ বলতে পারেনি।

এই ইতিহাসকে স্মরণ করে বগুড়ার মহাস্থানগরেড় প্রতি বছর বিনা প্রচারে, বিনা দাওয়াতে বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার লক্ষ্যাধিক মানুষ ও বিভিন্ন রকমের সাধু সন্ন্যাসিদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে। সুফি সাধক হযরত শাহ সুলতান (রাহঃ) ইতিহাসকে ঘিরে প্রতি বছর এখানে ওরস মোবারক, দোয়া মাহফিল, মাজার জিয়ারত হয়ে থাকে। পাশাপাশি সাধু-সন্ন্যাসীদের শরিয়ত, মারিফত ও বাউল সঙ্গীত আয়োজন করে থাকে বিভিন্ন সাধুরা। মেলারদনটিতে এখানে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে। আর এই মেলায় বিভিন্ন তৈজসপত্রের পাশাপাশি মুখোরচক খাবার হিসেবে কটকটি বেশ জনপ্রিয় খাবার হিসেবে পরিচিতি পেয়ে এসেছে। কটকটির প্রচলন এর সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও মুখে বলে থাকে প্রায় ২০০ বছর ধরে এই খাবারটি তৈরী ও বিক্রি হয়ে আসছে। কটকটি নামের এই মিষ্টান্ন খাবারটি শুধু বগুড়ায় তৈরী হয়ে থাকে। বগুড়ার মহাস্থানগড়ের ঐতিহ্যবাহি খাবারটি দেখতে শুকনো, তৈরী করা হয় ময়দার সঙ্গে মেশানো হয় চালের আটা, কখনো বা চালের আটা দিয়ে তৈরী হয়। তবে চালের আটা দিয়ে তৈরী করা হলে বেশ স্বাদের হয়ে থাকে।

চালে আটা গোলানো হয় পানিতে, সঙ্গে মাখানো হয় ডালডা। এরপর সেটির খামির তৈরি করে ছোট ছোট টুকরা করা হয়। টুকরাগুলো ভাজা হয় ফুটন্ত তেলে। এরপর সেগুলো ডোবানো হয় গুড়ের রসে। পরে ঠান্ডা হলে সেটি পরিবেশন করা হয়। বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের জেলা বগুড়ায় খাবারটি খুবই জনপ্রিয়তা ছুঁয়েছে। মহাস্থান এলাকায় এই কটকটির দোকান রয়েছে প্রায় শতাধিক। আর মেলাকে কে কেন্দ্র করে অস্থায়ী দোকান নিয়ে প্রায় ২০০ টি দোকান বসেছিলো ১৪ মে বৃহস্পতিবার। মেলা ছাড়া স্বাভাবিক দিনে প্রতিদিন কটকটি বিক্রি হয়ে থাকে প্রায় ১৫০ মন। প্রতি শুক্রবার বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২৫০ মন। এবছর মেলাকে ঘিরে কটকটি বিক্রি হয়েছে ডালডায় ভাজা ১৮০ টাকা থেকে ২২০ টাকা কেজি। মেলার দিন বিক্রি হয়েছে কোথাও ২৫০ টাকা কোথাও ২৩০ টাকা কেজি।

আর ঘী ভাজা কটকটি বিক্রি হয়েছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি। মেলাকে ঘিরে এবার প্রায় ২০০টি দোকান বসে। প্রতিটি দোকান গড়ে ৩০ মন করে কটকটি বিক্রি করলে পরিমান দাঁড়ায় ৬ হাজার মন। আর ৬ হাজার মন এর দাম দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। প্রতি কেজি কটকটির দাম গড়ে ধরা হয়েছে ২০০ টাকা করে। মহাস্থানগড়ের বড় দোকানগুলোর মধ্যে রয়েছে লাল মিয়া কটকটি ঘর, নাসির কটকটি প্যালেস, হামু মামা কটকটি প্যালেস, সুলতান কটকটি প্যালেস, চায়না কটকটি ঘর, আলাউদ্দিন কটকটি ভান্ডার, জিন্নাহ কটকটি ভান্ডার, ফাতেমা কটকটি প্যালেস, আল আমীন কটকটি প্যালেস, লায়েব কটকটি ভান্ডার, শাহাদত কটকটি ভান্ডার ইত্যাদি।

মৌসুমি কটকটি ব্যবসায়ি রুবেল মিয়া জানান, মেলা উপলক্ষ্যে তিনি পাইকারিভাবে কিনে ৪১ মন কটকটি বিক্রি করেছেন। শুক্রবার ভোরে তার সবকটকটি বিক্রি হয়ে যায়। তার ছোট ভাই আরো একটি দোকান দিয়ে বিক্রি করেছেন ৩৪ মন কটকটি। বিক্রি করেছেন ২২০ টাকা কেজি।

বগুড়ার বড় কটকটির দোকানের মধ্যে নাসির কটকটি একটি। মাজার গেট এর পাশে হওয়ার কারণে এই দোকানে ১৪ মে বিকালে এক ঘন্টায় বিক্রি করেছেন ২৩ মন কটকটি। বিক্রেতাদের কথা বলারমত সময়ও ছিলো না। বিক্রি করেছেন ২০০ থেকে শুরু করে ২৫০ টাকা কেজি। আর ঘী ভাজা কটকটি বিক্রি করেছেন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি।

রংপুর থেকে মেলায় আসা আব্দুল আউয়াল জানান, তিনি মেলা দেখে ও মাজার জিয়ারত করে পরিবারের জন্য ৪ কেজি কটকটি কিনেছেন। তিনি ২০০ টাকা কেজি কটকটি কিনেছেন।
বগুড়ার কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাওয়ার সময় কটকট শব্দ হওয়ার কারণেই এই খাবার কটকটি নামেই পরিচিতি পেয়ে যায়। আগে কটকটি বেশ শক্ত ছিল। এখন অনেকটাই নরম করে বানানো হয়।

ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতিদিনই কটকটি বিক্রি হয়। আর মেলার সময় প্রচুর চাহিদা থাকে কটকটির। কয়েকদিন আগে থেকে শ্রমিকরা কটকটি তৈরী করে মজুদ করে রাখে। এবারের মেলায় লোকসমাগম বেশি ছিলো। ব্যবসায়িরা বলছেন ৫ থেকে ৬ হাজার মন কটকটি বিক্রি হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মিষ্টান্ন খাবার কটকটি আর্থিক সফলতার মুখ দেখবে এবং এলাকায় কর্মসংস্থান তৈরি হবে। পাশাপাশি বাড়বে সরকারি রাজস্ব আয়।

বগুড়ার শিবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ শাহীনুজ্জামান শাহীন জানান, মেলাকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা যেন সুষ্ঠু থাকে সে বিষয়ে তদারকি করা হয়েছে। কটকটির দোকানে বেশি ভিড় ছিলো। সে কারণে তাদের এক পাশে বসিয়ে দেয়া হয়। অস্থায়ী কটকটির দোকানগুলোতে মানুষের ভিড় ছিলো বেশি।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button