ভ্রমণ

সুন্দরবনের উপকূলীয় জনপদে ইকো ট্যুরিজম: বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীবনমান

সুন্দরী ইকো রিসোর্ট ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাছির উদ্দিন বাদলের হাত ধরে উপকূলে কর্মসংস্থান ও প্রকৃতির সহাবস্থান

সুন্দরী ইকো রিসোর্টবিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রহস্যঘেরা সবুজ বনানী আর রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রতিচ্ছবি। তবে এই বনঘেরা উপকূলীয় জনপদ এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এক সময় যেসব মানুষের জীবিকা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ—মাছ ধরা, গোলপাতা কাটা কিংবা গভীর বন থেকে মধু সংগ্রহ—সেই অনিশ্চিত জীবনের চিত্র এখন অতীত হতে চলেছে। সুন্দরবনের কোলঘেঁষে নদীর ধারে প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি করে গড়ে উঠেছে আধুনিক ইকো রিসোর্ট ও কটেজ। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগগুলোই এখন হয়ে উঠেছে উপকূলীয় অঞ্চলের নতুন অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

সুন্দরী ইকো রিসোর্টবনঘেরা এই উপকূলে ঢাংমারীসহ আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়েছে এক নতুন পর্যটন কেন্দ্র। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড়ে এখন মুখরিত থাকে পশুর নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো। নদীভ্রমণ, বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ আর বিশুদ্ধ গ্রামীণ জীবনের স্বাদ নিতে পর্যটকরা বেছে নিচ্ছেন এসব পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট। বর্তমানে ড্যাংমারি ও ঢাংমারী এলাকায় গোল কানন, ইরাবতী, বনবিবি, বনলতা, বনবাস, সুন্দরী, পিয়ালি, জঙ্গলবাড়ি ও ম্যানগ্রোভ হ্যাভেনসহ মোট ১৭টি রিসোর্ট পর্যটকদের সেবা দিচ্ছে। এছাড়া আরও কয়েকটি কটেজ এখন নির্মাণাধীন পর্যায়ে রয়েছে।

এসব রিসোর্টের মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘সুন্দরী ইকো রিসোর্ট’। বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অক্ষত রেখে তৈরি করা এই রিসোর্টটি পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও এর নির্মাণশৈলীতে রাখা হয়েছে গ্রামীণ ছোঁয়া।

সুন্দরী ইকো রিসোর্টসুন্দরবন উপকূলের এই রিসোর্টগুলো ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশাল এক কর্মসংস্থান। স্থানীয় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন যুবক এখন গাইড, মাঝি, স্টাফ ও নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। আগে যাদের কাজের খোঁজে অন্য জেলায় পাড়ি দিতে হতো, তারা এখন নিজ এলাকাতেই সচ্ছলতার মুখ দেখছেন।

চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আবুল খায়ের, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাছির উদ্দিন বাদল এবং পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন, আজহারুল ইসলাম, ডি এম ডি রেজোয়ান মিঠুসহ কয়েকজন উদ্যমী উদ্যোক্তার হাত ধরে যাত্রা শুরু করে ‘সুন্দরী ইকো রিসোর্ট’। ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেও এই প্রতিষ্ঠানটি উপকূলীয় জনপদে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়মিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন, সুপেয় পানির সংকট নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা করার মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে সুন্দরী ইকো রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ।

সুন্দরী ইকো রিসোর্টশুধু পুরুষরা নন, এই নতুন অর্থনীতির সুফল পাচ্ছেন স্থানীয় নারীরাও। রিসোর্টগুলোকে কেন্দ্র করে বাড়ির আঙিনায় উৎপাদিত হাঁস-মুরগি, ডিম, সবজি ও ফলমূল সরাসরি বিক্রি করতে পারছেন তারা। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমছে এবং নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। স্থানীয় এক নারী উদ্যোক্তা জানান, “আগে নিজেরা যা উৎপাদন করতাম, তা সঠিক দামে বিক্রি করা কঠিন ছিল। এখন রিসোর্টেই সব সরাসরি বিক্রি হয়, লাভও বেশি পাচ্ছি”।

ইকো ট্যুরিজমের মূল লক্ষ্যই হলো পরিবেশের ক্ষতি না করে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো। সুন্দরী ইকো রিসোর্টের ম্যানেজমেন্ট সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে। সুন্দরী ইকো রিসোর্টের ম্যানেজার মো. শরিফ বলেন, “আমরা শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি যেন পর্যটন বাড়লেও বনের বা পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়। আমাদের কটেজগুলো স্থানীয় বাঁশ, কাঠ আর প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি। আমরা প্লাস্টিকের ব্যবহার ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে এনেছি”।

সুন্দরী ইকো রিসোর্টসুন্দরী ইকো রিসোর্টসুন্দরী রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাছির উদ্দিন বাদল এই উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু ব্যবসাই করছেন না, বরং এলাকার সামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রকৃতি রক্ষা করেই পর্যটন শিল্পের বিকাশ সম্ভব।

সুন্দরী রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাছির উদ্দিন বাদল তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা চেয়েছি প্রকৃতিকে পুরোপুরি অক্ষত রেখে একটি বিশ্বমানের পর্যটন সুবিধা গড়ে তুলতে। সুন্দরী রিসোর্টের কটেজগুলো তৈরিতে আমরা ইট-পাথরের বদলে বাঁশ, কাঠ আর স্থানীয় প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করেছি। তবে ব্যবসায়িক লাভের চেয়েও আমার কাছে বড় পাওয়া হলো, আমি এলাকার স্থানীয় মানুষদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছি। এক সময়ের অনিশ্চিত জীবনের মানুষদের হাতে আজ আমরা সম্মানজনক কাজ তুলে দিয়েছি—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন”।

সুন্দরী ইকো রিসোর্টসুন্দরবনের উপকূলে গড়ে ওঠা এই ইকো রিসোর্টগুলো কেবল পর্যটন বিকাশের মাধ্যম নয়; এগুলো এখন মানুষের জীবন বদলের কারিগর। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা এখন ঘুরছে নতুন গতিতে। প্রকৃতি আর মানুষের এই বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানই এখন সুন্দরবনের উপকূলে সম্ভাবনার নতুন মানচিত্র আঁকছে। টেকসই পর্যটন আর স্থানীয়দের স্বাবলম্বিতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের এই উপকূলীয় জনপদে।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button