বাংলা নববর্ষকে ঘিরে উৎসবের রঙে সেজে উঠল লন্ডনের বাংলাদেশ হাউস। বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগে শনিবার অনুষ্ঠিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রবাসী বাংলাদেশি, বিদেশি কূটনীতিক, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অতিথি এবং নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণে সৃষ্টি হয় অনন্য এক মিলনমেলা। দিনভর আয়োজনে ছিল বাঙালিয়ানা, আনন্দ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অপূর্ব সমন্বয়।
সকালের শুরুতেই অতিথিদের শুভেচ্ছা জানান ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার এম. নজরুল ইসলাম। ‘শুভ নববর্ষ ১৪৩৩’ লেখা উত্তরীয় পরিয়ে তিনি সবাইকে স্বাগত জানান। বক্তব্যে তিনি বলেন, বৈশাখ বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারক, যা মানুষকে ভেদাভেদ ভুলে একসূত্রে গাঁথে। নতুন বছর আমাদের জীবনে নতুন স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে আসে।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় ‘এসো হে বৈশাখ’। সুরের আবেশে উপস্থিত সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে নতুন বছরের উচ্ছ্বাস। অনেক অতিথিকেই গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে দেখা যায়। বাংলাদেশ হাউসের সাজসজ্জায় ছিল বিশেষ বৈশাখি ছোঁয়া। প্রবেশপথে রাখা হয় রঙিন রিকশা, চারদিকে আঁকা আলপনা, লোকজ মোটিফ, ফুলের সাজ ও বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা উপকরণ। অতিথিরা ছবি তুলে স্মরণীয় করে রাখেন মুহূর্তগুলো। কেউ কেউ মন্তব্য করেন—এ যেন লন্ডনের বুকে ছোট্ট এক বাংলাদেশ।
প্রাঙ্গণে স্থাপিত বিভিন্ন স্টলে তুলে ধরা হয় বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও রন্ধনশৈলী। ঝালমুড়ি, চটপটি, ফুচকা, পিঠা, মিষ্টি থেকে শুরু করে মধ্যাহ্নভোজে পান্তা-ইলিশ, ভর্তা, ডাল, সবজি ও নানা বাঙালি পদ ছিল সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। অতিথিরা খাবারের স্বাদ গ্রহণ করে আয়োজকদের প্রশংসা করেন।
আয়োজনের ব্যতিক্রমী অংশ ছিল একটি মজার বৈশাখি দোকান, যেখানে সবকিছুর দাম রাখা হয় বাংলাদেশি টাকায়। যারা কিনতে চান, তাদের জন্য খোলা হয় ‘বাকির খাতা’। দোকানির হাস্যরসাত্মক ঘোষণা—আগামী বছর হালখাতায় বকেয়া শোধ করতে হবে! এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ অতিথিদের মাঝে বাড়তি আনন্দ যোগ করে।
শিশুদের জন্য ছিল দৌড় প্রতিযোগিতা, বল সংগ্রহ খেলা, ফ্রিজবি নিক্ষেপসহ নানা মজার আয়োজন। বড়দের জন্য ছিল পাতিল ভাঙা, বালিশ খেলা ও অংশগ্রহণমূলক বিনোদন। প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কারও দেওয়া হয়, যা শিশু-কিশোরদের উৎসাহ আরও বাড়িয়ে তোলে। দিনভর চলে গান, কবিতা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক পরিবেশনা ও বাংলা সংস্কৃতিনির্ভর নানা অনুষ্ঠান। নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত ও অর্থবহ করে তোলে।
লন্ডনের মনোরম আবহাওয়া, লাল-সাদা পোশাকের ছটা, শিশুদের রঙিন উপস্থিতি এবং বাঙালিয়ানা আয়োজনে বাংলাদেশ হাউস সেদিন সত্যিই হয়ে উঠেছিল আনন্দ, ঐতিহ্য ও ভালোবাসার এক অনন্য ঠিকানা। অনুষ্ঠান শেষে অনেক অতিথিই বলেন, এমন আয়োজন প্রবাসজীবনে শেকড়ের টানকে আরও গভীর করে তোলে। পরিশেষে বলা যায় যে, লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন কর্তৃক আয়োজিত এবারের বৈশাখী আয়োজন সত্যিকার অর্থেই ‘কালচারাল ডিপ্লোমেসী’র একটি সফল প্রয়োগ।



