বিদেশহাইলাইটস

ইইউর নতুন শিল্পনীতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের উদ্বেগ

এস ইসলাম, লন্ডন থেকেইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নিজস্ব শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চীনা প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দিতে নতুন কিছু শিল্পনীতি গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। তবে প্রস্তাবিত এই উদ্যোগ যুক্তরাজ্যের শিল্পখাত ও সরবরাহব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।

পরিকল্পিত ব্যবস্থাটির আনুষ্ঠানিক নাম ’শিল্প ত্বরান্বিতকরণ আইন’ (Industrial Accelerator Act (IAA)। অনানুষ্ঠানিকভাবে এটি ‘মেইড ইন ইউরোপ’ পরিকল্পনা হিসেবে পরিচিত। প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো সরকারি ক্রয়াদেশ ও বিভিন্ন ধরনের সরকারি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

বার্নহ্যামের আশঙ্কা, এই নীতি কার্যকর হলে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত ব্রিটিশ সরবরাহ শৃঙ্খল সমস্যার মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ইস্পাত শিল্পের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ—উভয় পক্ষই একই ধরনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের একটি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বার্নহ্যাম জানান, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বিষয়টি উত্থাপন করবেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যকে ইউরোপের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং নতুন শিল্পনীতির কারণে ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় শিল্পের মধ্যে যাতে অপ্রত্যাশিত ক্ষতি না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ইউরোপের গাড়ি শিল্পও যুক্তরাজ্যকে প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, যুক্তরাজ্যকে বাদ দেওয়া হলে ইউরোপীয় গাড়ি শিল্পের সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। কারণ ব্রিটেন ও ইউরোপের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক বাণিজ্যিক ও উৎপাদন সম্পর্ক রয়েছে।

এদিকে, প্রস্তাবিত শিল্পনীতি নিয়ে মতপার্থক্য যুক্তরাজ্য ও ইইউর মধ্যকার চলতি বছরের শীর্ষ বৈঠককেও আরও বিলম্বিত করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের পরও বৈঠকটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ব্রেক্সিট ও ইইউতে ফেরার প্রশ্ন

বার্নহ্যাম একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ ইউরোপীয় সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেছেন। আগামী নির্বাচনে লেবার পার্টির ইশতেহারে যুক্তরাজ্যকে আবার ইইউতে যোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রাখা হবে কি না—এ বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো নিশ্চয়তা বা অঙ্গীকার করেননি।

তিনি বলেন, বর্তমানে তাঁর প্রধান লক্ষ্য হলো যুক্তরাজ্য ও ইইউর সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং এমন বাস্তবসম্মত চুক্তিতে পৌঁছানো, যা ব্রিটিশ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের কাজকে তিনি বর্তমান সময়ের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন।

বার্নহ্যামের মতে, এখনই ব্রেক্সিট নিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক বিতর্ক আবার শুরু করার পরিবর্তে বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে তরুণদের চলাচল, বাণিজ্য এবং অন্যান্য সহযোগিতার বিষয়ও থাকতে পারে।

ইইউর যুক্তরাজ্যবিষয়ক নতুন রাষ্ট্রদূত জুক্কা সালোভারা সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সম্ভাবনার দরজা বন্ধ নয়। তবে ভবিষ্যতে সহযোগিতা কতটা গভীর হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মূলত যুক্তরাজ্যের জনগণের ওপরই নির্ভর করবে।

বার্নহ্যাম এর আগে যুক্তরাজ্যকে তাঁর জীবদ্দশায় আবার ইইউর সদস্য হিসেবে দেখতে চান বলে মন্তব্য করেছিলেন। চলতি বছর তিনি ব্রেক্সিটকে ক্ষতিকর বলেও উল্লেখ করেছিলেন। তবে বর্তমানে তাঁর বক্তব্যে সরাসরি পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়ার চেয়ে যুক্তরাজ্য-ইইউ সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

প্রস্তাবিত ‘মেইড ইন ইউরোপ’ নীতি শেষ পর্যন্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকায় নতুন নীতির প্রভাব নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের উদ্বেগ রয়েছে।

বিশেষ করে ইস্পাত, গাড়ি এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল শিল্পে দুই পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য-ইইউ সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়াও ব্রিটিশ সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়।

সামগ্রিকভাবে, বার্নহ্যামের বক্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্ট—একদিকে তিনি ইউরোপীয় শিল্পকে সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছেন, অন্যদিকে এমন কোনো ব্যবস্থা চান না যার ফলে যুক্তরাজ্যের শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থা অপ্রত্যাশিত ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই আসন্ন যুক্তরাজ্য-ইইউ আলোচনায় অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও শিল্পস্বার্থের ভারসাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

 

এমন আরো সংবাদ

Back to top button