রাজনীতিসম্পাদকীয়হাইলাইটস

নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের যে প্রশ্ন!

পীপোল ফেসকি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে? মাঘের বিদায়ী শীত ও আগাম ফাগুনের হাওয়ায় এখন আর কেবল কৃষ্ণচূড়ার রঙ নেই, আছে এক তীব্র রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আর অদম্য কৌতূহলের মিশেল। চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রল কিনবা বিভিন্ন দপ্তর, সর্বত্রই একই গুঞ্জন। সাধারণ মানুষের মনে আজ প্রশ্নের পাহাড়। উৎসাহ, উদ্দীপনা আর এক অজানা আগ্রহে উন্মুখ হয়ে আছে কোটি জনতা। এবারের নির্বাচন কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার পরীক্ষা।

এবারের নির্বাচন অনেক দিক দিয়েই আলাদা, সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী এক মহাযজ্ঞ। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় এক কোটিরও বেশি নতুন ভোটার এবার প্রথমবারের মতো ব্যালট পেপারে নিজের আঙুলের ছাপ রাখবেন। এই তরুণদের বড় একটা অংশ তাদের সচেতন জীবনে সম্ভাব্য সরকারপ্রধান হিসেবে কোনো ‘পুরুষ’ নেতৃত্ব দেখেনি। দীর্ঘ দিন পর তারা আজ এমন এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে, যেখানে বিকল্পের ছড়াছড়ি। তাদের চিন্তার জগতটি আগের প্রজন্মের চেয়ে যোজন যোজন দূরে। তথ্য-প্রযুক্তির এই অবাধ প্রবাহের যুগে তাদের কাছে রাজনীতির সংজ্ঞা কেবল ‘মিছিল-মিটিং’ নয়, বরং সুশাসন আর কর্মসংস্থানের ডিজিটাল নিশ্চয়তা।

কিন্তু শুধু কি নতুন ভোটার? এবার নির্বাচনে যুক্ত হয়েছে এক নতুন মাত্রা, গণভোট। নাগরিকেরা কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন না, বরং নির্ধারণ করবেন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামোর গতিপথ। দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ কিংবা প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা, এসব গূঢ় বিষয়ে সাধারণ মানুষ যখন রায় দিতে যাবে, তখন পর্দার আড়ালে থেকে যায় হাজারো প্রশ্ন। সাধারণ মানুষ কি আসলেই এই পরিবর্তনের গভীরতা বুঝতে পারছে, নাকি আবেগের স্রোতে গা ভাসাচ্ছে?

সাধারণ মানুষের মনের অলিগলিতে ঘুরপাক খাচ্ছে কিছু মৌলিক প্রশ্ন। একজন রিকশাচালক কিংবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যখন বাজারের ব্যাগের বাস্তবতা দেখেন, তখন তার প্রশ্নটি খুব সহজ কিন্তু মর্মভেদী, “ভোট শেষে কি চালের দাম কমবে? বাজারে সিন্ডিকেটের যে রাজত্ব, তা কি ভাঙবে কোনো জাদুকরী ইশতেহারে?” আবার শিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রশ্নটি ভিন্ন, “যাকে ভোট দিচ্ছি, তিনি কি সংসদে গিয়ে আমার এলাকার মাদক কিংবা চাঁদাবাজি বন্ধে সোচ্চার হবেন? নাকি তিনিও হারিয়ে যাবেন ক্ষমতার অলিন্দে?”

তরুণ প্রজন্মের চোখে মুখে ফুটে ওঠে এক ভিন্ন আকাঙ্ক্ষা। তারা প্রশ্ন তোলে, “নতুন এমপি কি আমাদের জন্য কেবল সেতু আর কালভার্ট বানাবেন, নাকি মেধাভিত্তিক এক নতুন বাংলাদেশের পথ দেখাবেন?” তথ্য-প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগে তারা এমন এক নেতৃত্ব চায়, যারা বিশ্ব অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ বুঝবে, যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তরুণদের বেকারত্বের সমাধান খুঁজবে।

যুগ যুগ ধরে জেঁকে বসা সেই ঘুষ-বাণিজ্য ও দুর্নীতির অন্ধকার কি এবার তবে ঘুচবে? দপ্তরের দুয়ারে দুয়ারে সাধারণ মানুষের যে পুঞ্জীভূত দীর্ঘশ্বাস ও ভোগান্তি, তার কি চিরস্থায়ী অবসান ঘটবে? নাগরিক সেবা কি কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সাধারণের হাতের নাগালে পৌঁছাবে আধুনিকতার ছোঁয়ায়?

প্রশ্ন জাগে, এই দেশের অর্থনীতিকে টেনে তুলে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছে দেওয়ার এই কঠিন হাল কে ধরবেন? আমাদের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে আগামীর যোগ্য করে তোলার সেই মহান দায়ভার কার কাঁধে বর্তাবে? একদল দুর্বৃত্তের পেশ পেশিবাদ, সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজির সংস্কৃতির কি তবে সত্যিই পুরোপুরি ইতি ঘটতে যাচ্ছে?

রাষ্ট্রের দপ্তর কি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে? পত্রিকার পাতায় গা শিউরে ওঠা সেই ‘টেন্ডারবাজির শিরোনাম’ কি চিরতরে বন্ধ হতে যাচ্ছে? সাধারণ মানুষ আজ এমনই অজস্র অমীমাংসিত প্রশ্নের ভারে জর্জরিত হয়ে তাকিয়ে আছে আগামীর ব্যালট বাক্সের দিকে।

জনগণের এই যে অন্তহীন কৌতুহল, তা আসলে একটি সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ। মানুষ এখন আর কেবল ভোটার হয়ে থাকতে চায় না, তারা অংশীদার হতে চায়। তারা সরকার থেকে আকাশছোঁয়া প্রতিশ্রুতি চায় না; তারা চায় স্বস্তি, নিরাপত্তা এবং এক চিলতে সামাজিক মর্যাদা। তারা এমপি-দের কাছে কোনো অধরা স্বপ্ন নয়, বরং হাতের নাগালে থাকা একজন দায়বদ্ধ অভিভাবক আশা করে।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ এক নতুন সূর্যের অপেক্ষা করছে। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতায় বসানোর লড়াই নয়, এটি মানুষের হারানো আস্থার লড়াই। ভোটারদের মনে জমে থাকা শত শত প্রশ্নের উত্তর হয়তো মিলবে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির ব্যালট বাক্সে। তবে সেই উত্তরগুলো কি মানুষের মনের মতো হবে, নাকি সময়ের অতল গহ্বরে ঢাকা পড়বে নতুন কোনো বিতর্কে, সেই প্রশ্নটিই আজ সবচেয়ে বেশি জীবন্ত।

অপেক্ষা এখন কেবল সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যখন প্রশ্নগুলো উত্তরের মোহনায় গিয়ে মিলবে।

লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম

এমন আরো সংবাদ

Back to top button