প্রবাসহাইলাইটস

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক আমদানির লাভজনক নতুন স্কিম যেভাবে থমকে গেল

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক আমদানির লাভজনক নতুন স্কিম যেভাবে থমকে গেল। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগের জন্য প্রস্তাবিত একটি নতুন ও বিতর্কিত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনার জন্যও তোলা হয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম সেটি এজেন্ডা থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ৭ মে, দ্য এজ মালয়েশিয়ার প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল। বৈঠকের একপর্যায়ে বাংলাদেশ থেকে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ সংক্রান্ত নতুন স্কিমটি আলোচনায় তোলার প্রস্তুতি নেওয়া হলে প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ করেই সেটি তালিকা থেকে বাদ দিতে বলেন।

একটি সূত্র জানায়, বৈঠকে এ বিষয়ে কেউ কোনো মন্তব্য করেননি। বিষয়টি আলোচনার জন্য উঠতেই আনোয়ার কর্মকর্তাদের এটিকে এজেন্ডা থেকে সরিয়ে পরবর্তী বিষয়ে যেতে বলেন। কেন সরানো হলো, সে ব্যাখ্যাও দেননি। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কয়েকজন মন্ত্রিসভার সদস্য মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

দুই মন্ত্রণালয়ের অধীনে শ্রমিক ইস্যু:

মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম নতুন ব্যবস্থার বিষয়টি এজেন্ডা থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম নতুন ব্যবস্থার বিষয়টি এজেন্ডা থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে।

বিদেশি শ্রমিক সংক্রান্ত বিষয়গুলো মূলত মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন দাতুক সেরি সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইল এবং মানবসম্পদমন্ত্রী দাতুক সেরি আর. রামানান। তবে এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দেননি দুই মন্ত্রীই।

গত সপ্তাহে সংবাদ প্রকাশের পর রামানান নিশ্চিত করেন যে, টোরাপ নামে একটি নতুন ব্যবস্থা বিবেচনায় রয়েছে। “দ্য ইউনিভার্সাল রিক্রুটমেন্ট অ্যাডভান্স প্ল্যাটফর্ম” নামে পরিচিত এই সিস্টেমটি প্রস্তাব করেছে বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডি, যার মালিক বর্তমানে বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার আসামি হিসেবে ওয়ান্টেড।

রামানানের দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দেওয়াই হবে এই ব্যবস্থার লক্ষ্য। তবে তিনি এটাও বলেন, এ নিয়ে প্রকাশিত আগের সংবাদ পুরোপুরি সঠিক নয় এবং বিষয়টি নাকি মন্ত্রিসভা পর্যায়ে আলোচিতও হয়নি। কিন্তু একাধিক সূত্র বলছে, প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় আলোচনার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল।

একটি সূত্র জানায়, সংবাদ প্রকাশের আগেই বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার বৈঠকের এজেন্ডায় ছিল। অর্থাৎ বিষয়টি অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীই সেটি সরিয়ে দেন। অনুমোদন পেলে বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যেত।

গ্রাম পর্যায়ে শোষণ থামবে কীভাবে?

ডিএপির সাবেক তিন মেয়াদের সংসদ সদস্য চার্লস সান্তিয়াগো বলেন, বাংলাদেশে গ্রাম পর্যায়ে শ্রমিকদের শোষণই ঋণের ফাঁদে পড়ার প্রধান কারণ। তার প্রশ্ন, এআই ব্যবহার করলেও কীভাবে গ্রামের শ্রমিকদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করার প্রবণতা বন্ধ হবে? শুধু এজেন্ট নয়, বাংলাদেশে এটি রাজনীতিবিদদের জন্যও বড় ব্যবসা। এই ব্যবস্থায় যে হাজার হাজার কোটি টাকা ঘুরছে, তা থেকে অনেকেই লাভবান হচ্ছে।

অন্যদিকে বেস্টিনেট দাবি করেছে, টোরাপ ব্যবস্থা গ্রামের পর্যায় থেকেই নিয়োগ দুর্নীতি ও শোষণ কমাতে সহায়তা করবে। কোম্পানিটির মতে, এটি বিদ্যমান সিস্টেমের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে এবং অনিয়ম কমাবে।

এফডব্লিউসিএমএস ও বেস্টিনেটের ভূমিকা:

বর্তমানে বিদেশি শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় “ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম” (এফডব্লিউসিএমএস) ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বেস্টিনেট তৈরি ও পরিচালনা করছে। ২০২৮ সালের মধ্যে এটি “ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেটেড ইমিগ্রেশন সিস্টেম” দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে।

বেস্টিনেটের নিয়ন্ত্রক দাতুক সেরি আমিনুল ইসলাম মোহদ নূর এবং তার সহযোগী রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অর্থপাচার ও শ্রমিক শোষণের অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার তাদের বিচারের আওতায় আনতে চাইলেও এখন পর্যন্ত আমিনুলকে প্রত্যর্পণ করা সম্ভব হয়নি।

চার্লস সান্তিয়াগো বলেন, “এআই ব্যবহার করলেও গ্রামের শ্রমিকদের অতিরিক্ত অর্থ আদায় কীভাবে বন্ধ হবে?”
চার্লস সান্তিয়াগো বলেন, “এআই ব্যবহার করলেও গ্রামের শ্রমিকদের অতিরিক্ত অর্থ আদায় কীভাবে বন্ধ হবে?”

বিপুল অর্থের শ্রমবাজার:

২০১২ সালে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানো পুরোপুরি সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থার অধীনে ছিল। তখন একজন শ্রমিককে প্রায় ৩৫ হাজার বাংলাদেশি টাকা খরচ করতে হতো।

কিন্তু ২০১৩ সালে চুক্তি সংশোধন করে বেসরকারি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার পর খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ টাকা বা তারও বেশি। বর্তমানে একজন শ্রমিকের খরচ ৫ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশি নথি অনুযায়ী, শুধু ২০২৩ সালেই ৩ লাখ ৫১ হাজারের বেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় এসেছেন। প্রত্যেকে যদি গড়ে ৫ হাজার ডলার করে দিয়ে থাকেন, তাহলে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ের এজেন্টদের হাতে প্রায় ৭ বিলিয়ন রিঙ্গিত পৌঁছেছে।

বেস্টিনেটকে ঘিরে বিতর্ক:

২০১৮ সালে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বেস্টিনেটকে বিদেশি শ্রমিকদের নথিপত্র ও নিবন্ধন ব্যবস্থাপনার জন্য এফডব্লিউসিএমএস ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। সে সময় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আহমদ জাহিদ হামিদি। এ নিয়ে গত দুই বছর ধরে পার্লামেন্টারি সিলেক্ট কমিটিতে আলোচনা চলছে।

এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত আলোচনার দ্রুত সমাধানের জন্য জাহিদের নির্দেশেই কোম্পানিটিকে অনুমোদন দেওয়া হয়।

২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সরকার কোনো অর্থ পরিশোধ না করেই এফডব্লিউসিএমএস ব্যবহার করে বিদেশি শ্রমিকদের জন্য অস্থায়ী কর্মসংস্থান ভিজিট পাস (পিএলকেএস) ইস্যু করে। পরে বেস্টিনেট সরকারকে ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন রিঙ্গিত বকেয়া সেবামূল্যের দাবি জানায়।

মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান গত সপ্তাহে নিশ্চিত করেন যে টারাপ ব্যবস্থা বিবেচনায় রয়েছে।
মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান গত সপ্তাহে নিশ্চিত করেন যে টারাপ ব্যবস্থা বিবেচনায় রয়েছে।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ:

২০২৪ সালের আগে পর্যন্ত এফডব্লিউসিএমএস পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। সফটওয়্যারের “সোর্স কোড” এবং “সুপার আইডি” সরকারের একক নিয়ন্ত্রণে ছিল না, যা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

২০২৩ সালের মে মাসে অনুমোদনহীনভাবে ২৪টি বিদেশি শ্রমিক আবেদন অনুমোদনের ঘটনা ঘটেছিল। যদিও তদন্ত শেষে পুলিশ এটিকে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বলে উল্লেখ করে।

অবশেষে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার ও বেস্টিনেটের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপরই কোম্পানিটি সোর্স কোড সরকারের কাছে হস্তান্তর করে। এই চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিটি পিএলকেএস ইস্যুর জন্য বেস্টিনেট ২১৫ রিঙ্গিত পাবে।

টোরাপের উৎপত্তি

শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টদের ধারণা, টারাপ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় গত বছর। বর্তমান মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মধ্যেই নতুন শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন।

সূত্র জানায়, টোরাপ প্রস্তাব অনুযায়ী মালয়েশিয়ায় ১০টি এবং বাংলাদেশে ২০টি কোম্পানিকে নিয়োগ প্রক্রিয়ার “ফ্যাসিলিটেশন সেন্টার” হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হতে পারে।

বাংলাদেশে নতুন বাস্তবতা:

মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে স্টিভেন সিমের সঙ্গে এ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে স্টিভেন সিমের সঙ্গে এ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে শ্রমিক রপ্তানি খাতে স্বচ্ছতার দাবি জোরালো হয়েছে। বর্তমানে ১০২টি রিক্রুটিং কোম্পানি মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর অনুমোদন পেলেও নতুন সরকার আরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।

বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ৪২৬টি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানের তালিকা মালয়েশিয়ার কাছে জমা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি শ্রমিক প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। কারণ, বহু শ্রমিক কাজ ছাড়াই এসে বিপাকে পড়েছিলেন।

২০২১ সালের সমঝোতা স্মারকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক নেওয়ার কথা থাকলেও শুধু ২০২৩ সালেই ৩ লাখ ৫১ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করেন।

চলতি বছরের শেষে ওই সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। বাংলাদেশ চায় নতুন করে শ্রমবাজার খুলুক এবং আরও বেশি রিক্রুটিং কোম্পানি সুযোগ পাক। তবে মালয়েশিয়া এমন একটি নতুন ব্যবস্থা বিবেচনা করছে, যেখানে কমসংখ্যক কোম্পানি থাকবে এবং বেস্টিনেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে সংশ্লিষ্ট শিল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button