মতামত

সিনেমার নায়ক থেকে বাস্তবের চ্যালেঞ্জ: শপথের আগেই অগ্নিপরীক্ষায় বিজয়

সিনেমার নায়ক থেকে বাস্তবের চ্যালেঞ্জ: শপথের আগেই অগ্নিপরীক্ষায় বিজয়
তামিল সিনেমার প্রতি আমার ভালোবাসা অনেক দিনের। আর সেই জায়গা থেকে বিজয় শুধুই একজন অভিনেতা নন, বরং এক ধরনের আবেগের নাম। তাঁর সিনেমার পর্দায় বারবার দেখেছি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা এক সাহসী মানুষকে—কখনও প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কখনও জননেতা হিসেবে। তাই যখন বাস্তব রাজনীতিতে তিনি প্রবেশ করলেন, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এটি হয়তো আরেকজন অভিনেতার রাজনৈতিক শখ নয়; বরং দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে নতুন এক শক্তির উত্থান। আজকের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সেই ধারণা একেবারে ভুলও ছিল না।

বিজয়ের দল Tamilaga Vettri Kazhagam বা টিভিকে (TVK) এবারের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে ১০৮টি আসন জিতে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।  ২৩৪ আসনের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮টি আসন। কংগ্রেসের ৫ বিধায়কের সমর্থন পাওয়ার পর বিজয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৩-তে।

অন্যদিকে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী M. K. Stalin-এর নেতৃত্বাধীন ডিএমকে (DMK) জোট বড় ধাক্কা খেয়েছে। ডিএমকে একাই পেয়েছে ৫৯টি আসন, আর পুরো জোটের আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩। অপরদিকে এআইএডিএমকে (AIADMK) ও বিজেপি-সমর্থিত এনডিএ জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন।  এই ফলাফল স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে তামিলনাড়ুর মানুষ দীর্ঘদিনের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির বাইরে নতুন বিকল্প খুঁজছিলেন, আর সেই জায়গাটাই দখল করেছেন বিজয়।

কিন্তু আসল নাটক শুরু হয়েছে ফল ঘোষণার পর। তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল Rajendra Vishwanath Arlekar বিজয়কে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাতে এখনো রাজি হননি। তাঁর বক্তব্য, শুধু বৃহত্তম দল হওয়াই যথেষ্ট নয়; সরকার গঠনের আগে প্রয়োজনীয় ১১৮ জন বিধায়কের সমর্থনের প্রমাণ দিতে হবে। রাজ্যপাল মূলত চাইছেন লিখিত সমর্থনপত্র ও একটি স্থিতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিশ্চয়তা। তাঁর আশঙ্কা, পর্যাপ্ত সমর্থন ছাড়া সরকার গঠন করলে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

তবে এখানেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। কারণ ভারতের রাজনীতিতে এমন বহু নজির রয়েছে যেখানে ঝুলন্ত বিধানসভায় একক বৃহত্তম দলকে আগে শপথ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং পরে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে বলা হয়েছে। সেই তুলনায় বিজয়ের ক্ষেত্রে এত কড়া অবস্থান নেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—এটি কি শুধুই সাংবিধানিক সতর্কতা, নাকি এর পেছনে রাজনৈতিক চাপও কাজ করছে?

রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, বর্তমান ক্ষমতাসীন শিবির কোনওভাবেই বিজয়ের দ্রুত উত্থানকে সহজভাবে নিতে পারছে না। খুব অল্প সময়ে তিনি তরুণ ভোটার, মধ্যবিত্ত এবং সিনেমাপ্রেমী সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব তৈরি করেছেন। ফলে তাঁকে শুরুতেই রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা চলছে—এমন অভিযোগ এখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে বিরোধী দলগুলো প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেছে যে রাজভবনের অবস্থানের পেছনে কেন্দ্রের রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে।

বিজয়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন কমল হাসান -এর মতো ব্যক্তিত্বও। বামপন্থী দল ও ভিসিকে (VCK)-ও দাবি তুলেছে যে গণতন্ত্রের স্বার্থে বিজয়কে ফ্লোর টেস্টের সুযোগ দেওয়া উচিত।  এমনকি ডিএমকের কিছু নেতাও বলেছেন, যেহেতু টিভিকে একক বৃহত্তম দল, তাই সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ তাদেরই পাওয়া উচিত।

এখন পুরো তামিলনাড়ুর নজর একটাই প্রশ্নে—বিজয় কি শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসতে পারবেন? নাকি রাজনৈতিক সমীকরণ, চাপ এবং সাংবিধানিক জটিলতার ভেতরেই আটকে যাবে তাঁর প্রথম বড় রাজনৈতিক স্বপ্ন?

একটা বিষয় অবশ্য এখনই স্পষ্ট—বিজয় আর শুধুই সিনেমার “থালাপথি” নন। তিনি এখন এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার নাম, যিনি তামিলনাড়ুর বহু বছরের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

শাহাবুদ্দিন শুভ 

ফ্রান্স প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক 

এমন আরো সংবাদ

Back to top button