রাজনীতিহাইলাইটস

ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে দুলুর রাজকীয় প্রত্যাবর্তন: শান্ত ও আধুনিক নাটোর গড়ার অঙ্গীকার

১.৬২ লাখ ভোটের ম্যান্ডেট: ২০ বছর পর নাটোরে দুলুর ‘উন্নয়ন ও শান্তির’ নতুন মিশন

উপ-মন্ত্রী থেকে পূর্ণ মন্ত্রীর পথে? নাটোরবাসীর প্রত্যাশা ও দুলুর একগুচ্ছ স্বপ্ননাটোরের রাজনীতির বরপুত্র এবং আধুনিক নাটোরের রূপকার হিসেবে পরিচিত এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু আবারও সংসদীয় রাজনীতিতে ফিরেছেন বীরদর্পে। দীর্ঘ দুই দশকের রাজনৈতিক নির্বাসন, জেল-জুলুম ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাটোর-২ (সদর ও নলডাঙ্গা) আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে ১ লাখ ৬২ হাজার ৮৪১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের পর ২০২৬ সালের এই বিজয় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এক অনন্য উচ্চতা যোগ করেছে। মূলত সাবেক এই উপ-মন্ত্রীর আমলেই নাটোরে বড় ধরনের শিল্পায়ন ও বৈপ্লবিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের সূচনা হয়েছিল। ফলে তাঁর এই পুনরুত্থানে নাটোরবাসী এখন নতুন এক সমৃদ্ধ ও আধুনিক জনপদের স্বপ্ন দেখছে। বিশেষ করে দেশের রাজনৈতিক মহলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে যে, অভিজ্ঞ এই রাজনীতিক নতুন সরকারের পরবর্তী ধাপে গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন।

সম্প্রতি তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, এলাকার উন্নয়ন এবং জাতীয় রাজনীতির সমসাময়িক প্রেক্ষাপট নিয়ে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘ভালো সংবাদ’-এর মুখোমুখি হন তিনি। একান্ত এই সাক্ষাৎকারে দুলু খোলামেলা কথা বলেছেন নির্বাচনের নেপথ্য সমীকরণ, আওয়ামী লীগ-জামায়াতের ভোট রাজনীতির কৌশল, মাদক-সন্ত্রাসমুক্ত জনপদ গড়া এবং নাটোরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসহ তাঁর একগুচ্ছ স্বপ্নের কথা। তাঁর সেই দীর্ঘ আলাপচারিতার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন ভালো সংবাদের বিশেষ প্রতিনিধি এম আর জান্নাত স্বপন

ভালো সংবাদ: দীর্ঘ সময় পর নাটোর-২ আসনে ১ লাখ ৬২ হাজার ভোট পেয়ে আপনি বিজয়ী হলেন। এই বিজয়কে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? বিশেষ করে জামায়াত প্রার্থীর সাথে ৩২ হাজার ভোটের ব্যবধানকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু: নাটোরের মানুষ ইতিপূর্বেও ২০০১ সালে আমাকে ১ লাখ ১০ হাজার ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছিল। ২০২৬ সালে এসে জনসংখ্যা বেড়েছে, স্বাভাবিকভাবেই আমার প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল। আমি ১ লাখ ৬২ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছি; এতে আমি আনন্দিত এবং মহান আল্লাহর কাছে ও নাটোরবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ।

তবে আমি কখনো ভাবিনি জামায়াত ও আওয়ামী লীগ এক হতে পারে। অতীতে জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ভোট করেছি, কিন্তু এবার আমাকে ঠেকাতে আওয়ামী লীগ তাদের পুরো ভোট ব্যাংক জামায়াতকে দিয়ে দিয়েছে।

জামায়াতের নিজস্ব ভোট বড়জোর ৩৫-৪০ হাজার, কিন্তু তারা যে ১ লাখ ৩০ হাজার ভোট পেয়েছে, তার পুরোটাই আওয়ামী লীগের। দলীয় কিছু ষড়যন্ত্রকারী ও এই অদ্ভুত রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে আমি যতটা ব্যবধান (১ লক্ষ ভোট) আশা করেছিলাম, তা হয়নি। তবুও নাটোরের মানুষ সবসময় আমার পাশে ছিল এবং এবারও তারা আমাকেই বেছে নিয়েছে।

ভালো সংবাদ: এলাকায় আপনার প্রধান তিনটি অগ্রাধিকার এবং শহরের যানজট নিরসনে আপনার পরিকল্পনা কী?

এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু: আমার আগের মেয়াদে আমি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি। এবার আমার প্রথম অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থান। যারা দীর্ঘ ১৭-১৮ বছর রাজনৈতিক কারণে বা অন্য কোনোভাবে চাকরি পায়নি, তাদের জন্য আমি শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। বড় বিনিয়োগকারীদের সাথে কথা বলেছি, তারা আশ্বাস দিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, নাটোরে গ্যাসের সংযোগ নেই। নাটোরের ওপর দিয়ে গ্যাস রাজশাহীতে গেলেও আমরা বঞ্চিত। আমার নির্বাচনী ওয়াদা ছিলো আমাদের দল ক্ষমতায় গেলে দ্রুত গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করব, যা শিল্পায়নে বিপ্লব ঘটাবে।

শহর নিয়ে আমার বিশেষ পরিকল্পনা আছে। নাটোর বনলতা সেনের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহ্যবাহী শহর হলেও এখানে যানজট নিরসনে গত ২০ বছরে কোনো কাজ হয়নি। আমি নতুন একটি বাইপাস রোড নির্মাণ করতে চাই। এছাড়া নাটোর শহরে প্রতিদিন ৩২টি ট্রেন যাতায়াত করে, ফলে ৩২ বার রেলগেট বন্ধ করতে হয়। আমি নির্বাচনী ওয়াদা করেছি, ক্ষমতায় গেলে এখানে ফ্লাইওভার বা আন্ডারপাস নির্মাণ করে শহরকে যানজটমুক্ত করব।

ভালো সংবাদ: নাটোরের পর্যটন ব্যবস্থা নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু: নাটোরে রাজবাড়ি, রানি ভবানীর বাড়ি ও উত্তরা গণভবন থাকলেও নাটোরে ঘুরতে আসা পর্যটকদের থাকার মতো ভালো হোটেল বা রেস্টুরেন্ট নেই। আমি যখন এলজিআরডি মন্ত্রী ছিলাম, তখন বিল হালতির ভেতর দিয়ে চমৎকার রাস্তা করে দিয়েছিলাম যা বর্ষায় ডুবে যায় এবং শুকনো মৌসুমে দৃশ্যমান হয়। এই পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে ঘিরে উন্নত আবাসন ও খাবারের অবকাঠামো তৈরি করা আমার অন্যতম লক্ষ্য।

ভালো সংবাদ: মন্ত্রিসভায় আপনার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে গুঞ্জন আছে। দায়িত্ব পেলে কোন খাত নিয়ে কাজ করতে চান?

এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু: ক্ষমতা দেওয়া বা কেড়ে নেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। আমি সবসময় জনগণের হৃদয়ে ছিলাম এবং আছি। আমাদের দেশের মানুষ গরিব; যদি সুযোগ পাই তবে তাদের কল্যাণে যা যা করা প্রয়োজন, তার সবই করব ইনশাআল্লাহ।

ভালো সংবাদ: নাটোরকে কি আমরা ‘প্রতিহিংসামুক্ত’ এলাকা হিসেবে পাব? মাদক ও সন্ত্রাস দমনে আপনার অবস্থান কেমন হবে?

এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু: আমাদের নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন যে ৫ আগস্টের আগের সেই প্রতিহিংসার রাজনীতি আমরা পরিহার করেছি। আওয়ামী লীগ যে সন্ত্রাস ও অবিচার করেছে, আমরা তার পুনরাবৃত্তি করব না। আমি দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী থাকাকালীন নাটোরকে মাদকমুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত ঘোষণা করেছিলাম। আগামী দিনেও মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত নাটোর উপহার দেব।

ভালো সংবাদ: কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য ও যুবকদের কর্মসংস্থানে আপনার নতুন উদ্যোগ কী?

এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু: নব্বইয়ের দশকে আমি নাটোরে ‘প্রাণ’ কোম্পানির মতো বড় বিনিয়োগ এনে হাজার হাজার মানুষের, বিশেষ করে নারী কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছি। এবারও কৃষিভিত্তিক বড় প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগকারীদের সাথে কথা বলেছি। কৃষকদের ন্যায্য মূল্যের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন করা হবে যাতে তারা বাড়ি থেকেই পণ্য সরবরাহ করতে পারে।

ভালো সংবাদ: নাটোরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও ভূমি অফিসের হয়রানি বন্ধে আপনার পদক্ষেপ কী হবে?

এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু: নাটোরে একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এখন সময়ের দাবি। আমি দ্রুতই এর কার্যক্রম শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।

আর ভূমি ব্যাবস্থাপনার ক্ষেত্রে, আমি দায়িত্বে থাকতেই কম্পিউটার সিস্টেম চালু করে জটিলতা কমিয়েছিলাম। নতুন সরকার ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে হয়রানি বন্ধ করবে।

ভালো সংবাদ: রাষ্ট্র সংস্কারে আপনার ভূমিকা কী হবে এবং নাটোরবাসীর উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?

এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু: আমাদের নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদেশের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আধুনিক ও ডিজিটাল থেকে আরও উন্নত স্তরে যাবে। আমি বিশ্বাস করি, তাঁর নেতৃত্বে মানুষ নতুন এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখবে।

নাটোরবাসীর কাছে আমি চিরঋণী। অনেক ষড়যন্ত্র ও প্রতিকূলতার মাঝেও তারা আমাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছে। আমি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, ইনশাআল্লাহ রক্ত দিয়ে হলেও সেই ঋণ শোধ করব এবং একটি শান্ত ও উন্নত নাটোর উপহার দেব।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button