বিদেশ
রমজানের সৌন্দর্য ভাগাভাগিতে মিশরের মায়েদাতুর রহমান
রমজান মাস এলেই মিশরে শতাব্দীর প্রাচীন সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের মানবিকতার এক দৃষ্টান্ত চোখে পরে রোজাদারদের জন্য আল্লাহর রহমতে সাজানো ভালোবাসার খাবারের দস্তরখানা। যার নাম, মায়েদাতুর রহমান “مائدة الرحمن” বাংলা অর্থে “রহমতের দস্তরখান বা টেবিল” — যা এই পবিত্র মাসে সমাজের সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধকে নতুন করে জীবন্ত করে তোলে।প্রাচীন সভ্যতার এই দেশটিতে বিভিন্ন শহরের রাস্তাঘাট, মহল্লা, মসজিদের সামনে কিংবা ব্যস্ত সড়কের পাশে সারিবদ্ধ ভাবে বসানো হয় এই রহমতের টেবিল। এখানে বিনামূল্যে ইফতার পরিবেশন করা হয় দরিদ্র মানুষ, পথচারী, শ্রমজীবী, ভ্রমণকারী — মূলত যে কেউ প্রয়োজন অনুভব করলেই বসে খেতে পারেন। ধর্ম, বর্ণ বা সামাজিক অবস্থান — কোনো কিছুর ভিত্তিতেই এখানে বিভাজন নেই; বরং এটি এক উন্মুক্ত মানবিক আয়োজন।
ইতিহাসবিদদের মতে, Ma’edatur Rahman-এর ধারণাটি বহু শতাব্দী আগে ইসলামি দাতব্য সংস্কৃতির অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শুধু দান বা সদকার বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সামাজিক সংহতি, প্রতিবেশী সুলভ সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহমর্মিতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
রমজান মাসে রোজাদারদের ইফতার করানো ইসলামে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ হিসেবে বিবেচিত। সেই ধর্মীয় অনুপ্রেরণাই এই আয়োজনকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকিয়ে রেখেছে দেশটির ধর্মপ্রাণ মানুষেরা।
এই দস্তরখান বা টেবিল গুলো সাধারণত আয়োজন করেন ধর্নাট্য ব্যাক্তি, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা, মহল্লার বাসিন্দারা, ব্যবসায়ী, দাতাগণ, সামাজিক ও দাতব্য সংগঠন।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুরো পাড়া-মহল্লা মিলে একটি মায়েদাতুর রহমান পরিচালনা করছে। কেউ খাবারের খরচ দেন, কেউ রান্না করেন, কেউ পরিবেশন করেন — সব মিলিয়ে এটি এক সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ। ইফতার আয়োজনে এখানে সাধারণত মিশরের ঐতিহ্যবাহী ইফতার সামগ্রী খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা হলেও কোষাফ ও তাজা ফলের নির্যাস পান করার মাধ্যমে ইফতার শুরু করেন। পরে মা’হসী (আংগুর পাতা, বেগুন, জুকিনি, বাঁধা কপির ভেতরে ভাত) মলোকাইয়া (পাট শাকের স্যুপ), বামিয়া মা’ লাহমা (মাংস ও ঢেঁড়শ ভুনা), ফেরাখ মা’হামারা (মুরগির গ্রীল/ রোস্ট) এইস বেলাদী (দেশীয় আটার রুটি), তাজা ফল ও পুদিনা পাতার চা ইত্যাদি। খাবারের মান ও পরিমাণও বেশ উদার। অনেক সময় রেস্টুরেন্ট বা বড় ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানও এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
মায়েদাতুর রহমান শুধু ক্ষুধা নিবারণের উদ্যোগ নয়; এটি সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার এক শক্তিশালী মাধ্যম। এতে—দরিদ্র ও বিত্তশালীর দূরত্ব কমে পথচারী ও অপরিচিত মানুষের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে ওঠে সমাজে দান ও সহমর্মিতার সংস্কৃতি জোরদার হয় একই টেবিলে বসে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে ইফতার করেন — যা বাস্তবে সামাজিক সমতার এক সুন্দর প্রতীক।
আধুনিক ব্যস্ত নগর জীবনে, যেখানে মানুষ ক্রমেই একাকী হয়ে পড়ছে, সেখানে Ma’edatur Rahman মানবিকতার উষ্ণ বার্তা বহন করে। এটি মনে করিয়ে দেয় — সমাজের শক্তি লুকিয়ে আছে পারস্পরিক সহমর্মিতা, ভাগাভাগি ও মানবিক দায়িত্ববোধে।
রমজান মাসে মিশরের এই ঐতিহ্য তাই শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং মানবিকতার এক অনুপম সামাজিক আন্দোলন — যা বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।



