মতামতহাইলাইটস

যেখানে বাতাসে মাটির গন্ধ, জলে শান্তির ছোঁয়া

Reseller Hosting - Reseller Standard
গ্রামের প্রতি ভালোবাসা আমার নতুন কিছু নয়। শৈশব, কৈশোর, জীবনের অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে গ্রামের মাটির সঙ্গে। গ্রামের খোলা আকাশ, সবুজ মাঠ, পাখির ডাক, নদীর কলকল ধ্বনি—এসব আমার হৃদয়ের গভীরে গেঁথে আছে। হয়তো সেই কারণেই গ্রামের নাম শুনলেই আজও মনটা অন্যরকম হয়ে যায়।

গত শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে গুলশানের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় ফোন করলেন প্রিয় বায়েজিদ ভাই। ফোনের ওপার থেকে প্রশ্ন করলেন, “কি ভাই, গ্রাম দেখতে যাবেন নাকি?”

আমি কিছুটা অবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, “কোথায়?”

তিনি বললেন, “সাভারের কাছে চর সিঙ্গুইর। একেবারে নির্মল পরিবেশ। প্রকৃত গ্রাম বলতে যা বোঝায়, তার সবকিছুই সেখানে আছে।”

গ্রামের নাম শুনেই যেন মনটা ছুটে গেল। আর দ্বিতীয়বার ভাবিনি। দ্রুত মোবাইল আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। খামারবাড়ি মোড়ে পৌঁছে আমরা গাড়িতে উঠলাম। শুরু হলো সাভারের পথে আমাদের যাত্রা।

আমিনবাজার পার হওয়ার সময় রাস্তার দুই পাশে শত শত পতাকা চোখে পড়ল। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা বাতাসে উড়ছে। কোথাও বিশাল আকৃতির পতাকা, কোথাও আবার আকাশ ছুঁয়ে ফেলা উঁচু খুঁটি। মনে হচ্ছিল, কে কত বড় পতাকা উড়াতে পারে, তা নিয়ে যেন এক নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। ভাবছিলাম, ফুটবল বিশ্বকাপের সময় ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার মানুষের মধ্যেও হয়তো এত উন্মাদনা দেখা যায় না, যতটা আমরা বাংলাদেশিরা দেখাই।

সাভার বাজারে পৌঁছে আমরা ঘুরে দেখলাম সরকারি একটি নার্সারি। সেখানে সারি সারি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা সাজানো। মানুষজন নিজেদের পছন্দমতো গাছ কিনছেন। কারও হাতে আমগাছ, কারও হাতে লিচু, আবার কেউ কিনছেন ফুলের গাছ। সবুজের এই সমারোহ মনকে এক অন্যরকম প্রশান্তি দিল।

এরপর আমাদের যাত্রা শুরু হলো ধামরাইয়ের চর সিঙ্গুইর গ্রামের উদ্দেশ্যে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় চড়ে যখন সাভার পৌর এলাকার সীমা অতিক্রম করলাম এবং বংশী নদী পার হলাম, তখন হঠাৎ করেই মনটা অন্যরকম হয়ে গেল। শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে পিছনে পড়ে রইল, আর সামনে খুলে গেল প্রকৃতির বিশাল দুয়ার।

দুই পাশ জুড়ে সবুজ ধানের ক্ষেত। কোথাও পাটক্ষেত বাতাসে দুলছে, কোথাও সবজি বাগান। সরু মেঠোপথ ধরে হাঁটছেন কৃষকরা। দূরে দেখা যাচ্ছে গরুর পাল ঘাস খাচ্ছে। তাল, খেজুর আর নারকেল গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে দোয়েল, শালিক আর কোকিলের ডাক। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য আমাকে যেন শৈশবের দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।

মনে হচ্ছিল, এ যেন আমারই গ্রাম। এ যেন আমার হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলার পৃথিবী। সেই কাঁচা রাস্তা, সেই পুকুরপাড়, সেই বিকেলের খেলা, সেই নির্ভেজাল আনন্দ—সবকিছু যেন আবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।

চর সিঙ্গুইর গ্রামে পৌঁছে নামের সঙ্গে গ্রামের পরিবেশের এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেলাম। যে বাড়িতে আমরা পৌঁছালাম, তার ঠিক পেছনেই বিশাল জলাভূমি। কচুরিপানায় ভরা সেই জলরাশি দেখতে যেন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। কয়েকজন কিশোর জাল ফেলে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। তাদের হাসি আর চিৎকারে চারপাশ মুখরিত। ছোট ছোট নৌকা এপাড়-ওপাড় ছুটে বেড়াচ্ছে। মাঝেমধ্যে নৌকার বৈঠার শব্দ জলের বুকে এক মধুর সুর তুলছে।

দূরে দেখা যাচ্ছিল কিছু নারী কলসি নিয়ে ঘাটে পানি তুলতে এসেছেন। শিশুরা খালি পায়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। কেউ গাছে উঠছে, কেউ পুকুরে ঝাঁপ দিচ্ছে। তাদের মুখের সরল হাসি দেখে মনে হচ্ছিল, সুখ আসলে কত সহজ হতে পারে!

বিশেষ করে শহরের কংক্রিটের দেয়াল আর এসির ঠাণ্ডা বাতাসের মধ্যে এমন প্রশান্তি কোথায়! গ্রামের সেই বাড়ির খাটে বসে যখন এক গ্লাস শরবত খেলাম, মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু পানীয় পান করছি। প্রকৃতির মাঝে বসে সাধারণ একটি শরবতও যেন অমৃত হয়ে ওঠে।

সঙ্গে বাড়তি কাপড় থাকলে হয়তো নদীর জলে নেমে যেতাম। অনেকক্ষণ সাঁতার কাটতাম, জলের সঙ্গে মিশে যেতাম। সেই ইচ্ছা এবার পূরণ না হলেও আশা করি, কোনো একদিন আবার সেখানে ফিরে যাব।

বিকেলের দিকে যখন শীতল বাতাস বইতে শুরু করল, তখন মনটা আরও আবেগপ্রবণ হয়ে উঠল। চারদিকে নিস্তব্ধতা, শুধু পাখির ডাক আর বাতাসের শব্দ। মনে হচ্ছিল, জীবনের সমস্ত ক্লান্তি, হতাশা আর দুশ্চিন্তা যেন এই বাতাসের সঙ্গে উড়ে যাচ্ছে।

মনে মনে ভাবছিলাম, যদি সারাজীবন এই রকম একটি পরিবেশে কাটিয়ে দিতে পারতাম! যদি শহরের কোলাহল, যানজট, ব্যস্ততা আর কৃত্রিমতার বাইরে এসে প্রকৃতির এই কোলে নিজেকে সমর্পণ করতে পারতাম! কিন্তু বাস্তবতা বড় কঠিন। কর্মজীবন, দায়িত্ব আর নাগরিক জীবনের নানা ব্যস্ততা আমাদের সেই সুযোগ খুব কমই দেয়।

গ্রামের মানুষগুলোকে দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। তাদের সরলতা, আন্তরিকতা এবং অতিথিপরায়ণতা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। তারা যেন অচেনা কাউকেও আপন করে নিতে জানে। তাদের হাসিমুখ, আন্তরিক অভ্যর্থনা আর আপ্যায়ন আমাকে বারবার বিস্মিত করেছে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। পশ্চিম আকাশে সূর্য ধীরে ধীরে লাল আভা ছড়িয়ে বিদায় নিচ্ছিল। নদীর জলে সেই লাল আলো ঝিলমিল করছিল। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন তার দিনের শেষ রঙতুলি দিয়ে এক অপূর্ব ছবি আঁকছে। সেই দৃশ্য আজও চোখের সামনে ভাসে।

এরকম গ্রামে বারবার যেতে ইচ্ছে করে। যেতে ইচ্ছে করে পরিবার-পরিজনকে নিয়ে। চাই আমার সন্তানরাও দেখুক প্রকৃত বাংলাদেশের সৌন্দর্য, অনুভব করুক মাটির গন্ধ, শুনুক পাখির গান, চিনুক গ্রামের মানুষদের।

সবশেষে বিশেষ ধন্যবাদ জানাতে চাই প্রিয় বায়েজিদ ভাইকে। তিনি একজন সাংবাদিক, বর্তমানে প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অন্যতম কান্ডারি এবং জনপ্রিয় টকশো হোস্ট। তাঁর আমন্ত্রণেই এই অসাধারণ অভিজ্ঞতার অংশ হতে পেরেছি। এমন একটি সুন্দর গ্রামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

কিছু কিছু ভ্রমণ শুধু ভ্রমণ নয়, হয়ে ওঠে স্মৃতি। চর সিঙ্গুইরের এই সফরও আমার জীবনের তেমনই এক স্মৃতি হয়ে থাকবে—যেখানে প্রকৃতি, মানুষ আর শৈশবের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো একসূত্রে গাঁথা হয়ে আছে।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button