বন থেকে কপ৩১: জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কেন এতো চাপ
জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক মধ্যবর্তী বৈঠক শেষ হয়েছে জার্মানির বন শহরে। দুই সপ্তাহব্যাপী এই প্রযুক্তিগত আলোচনার সমাপ্তিতে নানা প্রক্রিয়াগত বিষয় সামনে এলেও একটি বার্তা ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট—জীবাশ্ম জ্বালানির যুগ শেষ করার প্রতিশ্রুতিকে আর কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।
তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়ার ৯৪টি নাগরিক সমাজ সংগঠনের একটি জোট যৌথ বিবৃতিতে আসন্ন কপ৩১ সম্মেলনের নেতৃত্বকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার বৈশ্বিক প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
১২ জুন তুরস্কের পরিবেশমন্ত্রী মুরাত কুরুম এবং অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস বোয়েনের কাছে পাঠানো এই বিবৃতি প্রকাশ করা হয় বন জলবায়ু আলোচনার সময়। ৮ থেকে ১৮ জুন অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে গত বছরের ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত কপ৩০ এবং আগামী নভেম্বরে তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য কপ৩১-এর মধ্যবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিমূলক ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রায় তিন বছর আগে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত কপ২৮ সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা জ্বালানি খাতে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এখনো প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।
তাদের মতে, কপ৩১-এর যৌথ নেতৃত্বে থাকা তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখন একটি বিরল সুযোগ এসেছে—২০২৩ সালের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার।
নাগরিক সমাজের চারটি প্রধান দাবি
যৌথ বিবৃতিতে কপ৩১ নেতৃত্বের প্রতি চারটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। প্রথমত, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ন্যায্য, সুশৃঙ্খল ও সমতাভিত্তিক উত্তরণের জন্য সুস্পষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রদানের আহ্বান জানানো হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কপ৩০-এ নীতিগতভাবে অনুমোদিত “জাস্ট ট্রানজিশন মেকানিজম”কে বাস্তব রূপ দিতে নির্দিষ্ট অর্থায়ন, সময়সীমা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে, যাতে শ্রমিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।
তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, অভিযোজন এবং ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ খাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনগুলোর বক্তব্য, “যারা সবচেয়ে বেশি দূষণ করেছে, তাদেরই সবচেয়ে বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হবে।”
চতুর্থত, জাতিসংঘের জলবায়ু প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের প্রভাবমুক্ত আলোচনা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক সমাজ, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নারী, তরুণ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনগুলো আরও বলেছে, আন্তর্জাতিক কূটনীতির বাইরে নিজ নিজ দেশেও জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমানোর জন্য তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়াকে স্পষ্ট জাতীয় রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর অস্তিত্বের প্রশ্ন
গ্রীনপিস অস্ট্রেলিয়া প্যাসিফিকের প্যাসিফিক প্রধান শিবা গাউন্ডেন বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলো তিন দশক ধরে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা সীমা এবং ক্ষয়ক্ষতি তহবিল প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে আসছে। তার ভাষায়, “প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধ করা এবং ১.৫ ডিগ্রি সীমা ধরে রাখা শুধু জলবায়ু নীতির বিষয় নয়, এটি বেঁচে থাকার প্রশ্ন।”
অন্যদিকে ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী ডেনিস কাউচি বলেন, অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জীবাশ্ম জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ। তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হলে দেশটিকে জীবাশ্ম জ্বালানি ও এর রপ্তানি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে হবে।
একইভাবে ডব্লিউডব্লিউএফ-তুরস্কের তানিয়েলি বেহিচ সাবুনজু উল্লেখ করেন, তুরস্কের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ এখনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে। এমনকি নতুন কয়লাভিত্তিক প্রকল্পও পরিকল্পনাধীন রয়েছে। তিনি তুরস্ককে দ্রুত কয়লা বিদ্যুৎ বন্ধের সময়সূচি ঘোষণা করার আহ্বান জানান।
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান
বৈজ্ঞানিক তথ্যও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল ছিল ইতিহাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় উষ্ণতম বছর। ওই বছরে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ১.৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
২০১৫ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত সময়কাল রেকর্ড করা সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর এবং ২০২৩ থেকে ২০২৫ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ তিন বছরের সময়কাল। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, প্যারিস চুক্তির ১.৫ ডিগ্রি সীমা এখনো পুরোপুরি অতিক্রম করা না হলেও বিশ্ব দ্রুত সেই সীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির ‘ইমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট’ বারবার দেখিয়েছে, বর্তমান জাতীয় জলবায়ু প্রতিশ্রুতিগুলো ১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
বন বৈঠকে কী হলো?
বনের আলোচনা ছিল মূলত কপ৩১-এর জন্য রাজনৈতিক ও কারিগরি ভিত্তি প্রস্তুতের প্রক্রিয়া। এখানে ‘জাস্ট ট্রানজিশন ওয়ার্ক প্রোগ্রাম’, ‘বেলেম অ্যাকশন মেকানিজম’ এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।
তবে অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রগতি ধীর ছিল। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর কিছু দেশের আপত্তির কারণে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।
তবে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও হয়েছে। কপ৩১-এর সম্ভাব্য নেতৃত্ব ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবহারে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য সামনে এনে একটি নতুন উদ্যোগের প্রস্তাব দিয়েছে, যা পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো স্বাগত জানিয়েছে। তবে তাদের বক্তব্য, জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন কমানোর সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া শুধু বিদ্যুতায়ন যথেষ্ট নয়।
কেন তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়া?
এই দুই দেশকে লক্ষ্যবস্তু করার পেছনে বিশেষ কারণ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ালেও এখনো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কয়লা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ। অন্যদিকে তুরস্কে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও বিদ্যুতের বড় অংশ এখনো কয়লা থেকে আসে।
নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দিতে চাইলে নিজ দেশেও সেই নেতৃত্বের বাস্তব উদাহরণ দেখাতে হবে।
জলবায়ু ন্যায়বিচার ও বৈশ্বিক দক্ষিণ
জীবাশ্ম জ্বালানি বিতর্কের অন্তরালে রয়েছে আরেকটি দীর্ঘদিনের প্রশ্ন—জলবায়ু ন্যায়বিচার। উন্নয়নশীল দেশগুলোর দাবি, তারা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলেও বৈশ্বিক নির্গমনে তাদের অবদান তুলনামূলকভাবে কম।
তাই জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণের খরচ বহনের জন্য ধনী ও উচ্চ নির্গমনকারী দেশগুলোকেই বেশি অর্থায়ন করতে হবে। এই কারণেই “বিগ পলিউটার্স পে” বা “বড় দূষণকারীদেরই মূল্য দিতে হবে”—এই দাবিটি ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে।
আনতালিয়ার আগে বাড়ছে চাপ
আনতালিয়ায় কপ৩১ শুরু হতে এখনো কয়েক মাস বাকি। কিন্তু নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলো এখন থেকেই রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে চাইছে। তাদের বক্তব্য, নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে। দুবাই, বেলেম এবং বন—তিনটি পর্যায়েই প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক আলোচনা হয়েছে।
এখন বিশ্বের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—সরকারগুলো কি অবশেষে নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে? আনতালিয়ায় সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে কপ৩১ ইতিহাসে একটি মোড় পরিবর্তনের সম্মেলন হিসেবে স্মরণীয় হবে, নাকি আরেকটি হারানো সুযোগ হিসেবে চিহ্নিত হবে।
লেখক: জার্নালিস্ট ও ক্লাইমেট অ্যাক্টিভিস্ট
অস্ট্রেলিয়ান ইয়ুথ ক্লাইমেট কোয়ালিশন (AYCC)



