কৃষি

আম আহরণ নিয়ে শঙ্কা জাগাচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ও দুর্যোগের পূর্বাভাস

rup riti agro framরাজশাহী জেলায় গাছ থেকে পাকা আম আহরণ শুরু হচ্ছে আজ। কিছুদিনের মধ্যেই দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পাকা আম পাড়া শুরু হয়ে যাবে। ফলন আহরণের এ মুহূর্তে এখন আশঙ্কার বড় কারণ হয়ে উঠেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস। দুর্যোগের অভিঘাতে বিপুল পরিমাণ আম গাছেই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। জাতবৈচিত্র্য ও আঞ্চলিক আবহাওয়ার ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আম পাকার সময়ে ভিন্নতা দেখা যায়। এর ভিত্তিতে বিভিন্ন জেলায় আলাদা পাড়ার সময়সূচি বা ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ প্রকাশ করে জেলা প্রশাসন। সারা দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আম সংগ্রহের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয় মে মাসে। কয়েকটি জেলা এরই মধ্যে আম পাড়ার ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সাতক্ষীরা ও মেহেরপুরের হিমসাগর ও গোপালভোগ এবং রাজশাহী জেলার গোপালভোগ ও ল্যাংড়া সংগ্রহ করা হয়। তৃতীয় সপ্তাহে যশোর ও কুষ্টিয়ার হিমসাগর সংগ্রহ করা হয়। আর মে মাসের শেষ সপ্তাহে সাতক্ষীরা, যশোর ও মেহেরপুরের ল্যাংড়া, ঝিনাইদহ ও দিনাজপুরের হিমসাগর এবং কুষ্টিয়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোপালভোগ সংগ্রহ করা হয়।

কিন্তু মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস এখন কৃষক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, ঘূর্ণিঝড় হলে সে সময় গাছে থাকা পাকা আম ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল বলা হয়, ৭ মে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিলে তা কোথায় আঘাত হানবে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিশ্চিত হতে আরো দু-একদিন লেগে যেতে পারে।

কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ  বলেন, ‘ইউরোপিয়ান মডেল অনুসারে সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টি ১২ মে দুপুর ১২টার পর থেকে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম উপকূলের ওপর দিয়ে এবং আমেরিকান মডেল অনুসারে ১৩ মে দুপুর ১২টার পর থেকে স্থলভাগে উত্তর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ভোলা জেলার উপকূল দিয়ে স্থলভাগে আঘাত করার সম্ভাবনা রয়েছে। সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ হলো যে পুরো বঙ্গোপসাগরের মধ্যে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রার সর্বোচ্চ বিচ্যুতি দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের উপকূলে। প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যে স্থানের সমুদ্রের পানির তাপমাত্রার বিচ্যুতি যত বেশি সেই স্থানে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তিশালী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণ তত বেশি। আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেলগুলোর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুসারে সম্ভাব্য এ ঘূর্ণিঝড় স্থলভাগে আঘাত করার সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ থাকতে পারে ১৫০ থেকে ১৮০ কিলোমিটার।’

দেশে আম উৎপাদনে শীর্ষ জেলাগুলোর একটি মেহেরপুর। এখানে আমের বাগান রয়েছে ২ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে। জেলার কৃষকরা জানিয়েছেন, এ বছর তীব্র তাপদাহে ছোট ছোট আম ঝরে পড়েছে। তবে ঝরে পড়লেও এবার ফলন বেশি হয়েছে। যদিও তাপদাহের কারণে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার আমের আকার ছোট হয়েছে।

মেহেরপুরের সদর উপজেলার আমঝুপি গ্রামের বাগান মালিক টিপু মোল্লা বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমের পরিপক্বতা আসেনি। এদিকে দেখা দিয়েছে ঝড়বৃষ্টির আশঙ্কা। বুঝতে পারছি না এখন আমাদের কী করণীয়। ঝড়ে যদি আম ঝরে যায় তাহলে গত বছরের মতো এবারো লোকসানের মুখে পড়ব আমরা। কারণ আমগুলো এ মুহূর্তে পাকানো সম্ভব নয়। স্থানীয় বাজারে আচার খাওয়ার জন্য বিক্রি করা গেলেও খুব বেশি পরিমাণ বিক্রি হবে না। আমাদের লোকসান গুনতে হবে।’

বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা। গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন বলেন, ‘অনেকদিন বৃষ্টি না হওয়ার ফলে হঠাৎ একদিন বৃষ্টি হলে আম ঝরে পড়ে। তাছাড়া আমের সাইজ খুব ছোট বলে মনে হয়নি এখন পর্যন্ত। তবে আরো সময় আছে দেখা যাক কী অবস্থা হয় । আর ৮ মে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে জেলার কৃষক, কৃষি অফিস ও আম ব্যবসায়ীসহ আমাদের একটি আলোচনা রয়েছে। সেখানে আমাদের আম নিয়ে কী করণীয় সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। ঘূর্ণিঝড়ের কথা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

সাধারণত গুটি জাতের আম বিভিন্ন জেলায় মে মাসের শুরু থেকেই পাড়া শুরু হয়। তবে আম কর্তনের জন্য আলাদা ক্যালেন্ডার প্রকাশ করে থাকে জেলা প্রশাসন। সে অনুযায়ী বিভিন্ন জেলায় আমচাষীরা আম পাড়া শুরু করেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে আজ থেকে রাজশাহীতে আম পাড়া শুরু হচ্ছে। গতকাল রাজশাহী জেলা প্রশাসন ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ ঘোষণা করে। রাজশাহীর নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী আজ থেকে সব ধরনের গুটি জাতের আম পাড়া যাবে। ১৫ মে থেকে গোপালভোগ, ২০ মে থেকে লক্ষ্মণভোগ বা লখনা ও রাণীপছন্দ এবং ২৫ মে থেকে হিমসাগর বা ক্ষীরসাপাতি হাটে তুলতে পারবেন বাগানমালিক ও চাষীরা। আর ৬ জুন থেকে ল্যাংড়া, ১৫ জুন থেকে ফজলি ও ১০ জুন আম্রপালি, ১০ জুলাই থেকে আশ্বিনা, গৌড়মতী ও বারি আম-৪ এবং ২০ আগস্ট থেকে ইলামতী আম পাড়া যাবে। তবে কাটিমন ও বারি আম-১১ সারা বছর সংগ্রহ করতে পারবেন চাষী ও বাগান মালিকরা।

জেলায় ১৯ হাজার ৫৭৮ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩৩ লাখ ৬৩ হাজার ৯৮৬টি আম গাছ রয়েছে। এবার জেলায় ৯৫ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছিল। এখান থেকে এ বছর মোট ২ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫০ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজদার হোসেন বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের কথা মাত্র শোনা যাচ্ছে। অনেক সময় ঘূর্ণিঝড় গতিপথও পরিবর্তন করে থাকে। সে হিসেবে যদি আমরা ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়ে নিশ্চিত হই, তাহলে অবশ্যই কৃষকদের সুবিধা অনুযায়ী আম পাড়ার জন্য নির্দেশনা দেব। যেটা সব সময় সব ফসলের ক্ষেত্রেই দেয়া হয়ে থাকে। ধানের ক্ষেত্রেও কোনো দুর্যোগের বিষয়ে জানলে আগে থেকে ফসল কর্তনের উপযোগী হলে আমরা সেটা কেটে ফেলার নির্দেশনা দিয়ে থাকি।’

ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেছিল সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনও। জেলাটিতে এ বছর ১২ মে থেকে আম পাড়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে আবহাওয়াগত দিক বিবেচনায় নিয়ে আগামী ৫ মে থেকেই জেলাটিতে আম সংগ্রহ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১২ মে থেকে আম সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু আবহাওয়ার কারণে তা এক সপ্তাহ এগিয়ে আনা হয়েছে।’ সাতক্ষীরায় আগে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, ১২ মে থেকে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, বোম্বাই, গোপালখাস, বৈশাখীসহ অন্যান্য স্থানীয় জাতের আম, ২৫ মে থেকে হিমসাগর বা ক্ষীরসাপাতি, ১ জুন থেকে ল্যাংড়া ১৫ জুন থেকে আম্রপালি সংগ্রহের নির্দেশনা ছিল।

দেশে আম উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় আরেক জেলা নওগাঁ। স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মনজুরে মাওলা বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে আম রক্ষার ক্ষেত্রে চাষীদের গাছে খুঁটি দিয়ে সাপোর্ট দিতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। খুঁটি থাকলে সহজে আম ডালসহ হেলে পড়বে না। তবে অনেক আম ঝড়ে পড়তে পারে। ঝড়ে পড়া কাঁচা আম বিপণনের পূর্ব পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চাষীদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এতে দুর্যোগে আমচাষীদের লোকসান কিছুটা কম হবে।’

কৃষিবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে একই জাতের আম একেক জেলায় একেক সময়ে পাকে। এ কারণেই বিভিন্ন জেলায় আলাদা সময়ে আম সংগ্রহের সময় নির্ধারণ করে দেয় প্রশাসন। বিজ্ঞান সাময়িকী সাসটেইনেবিলিটিতে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘অ্যাপ্লিকেশন অব জিওস্পেশাল টেকনিকস ইন ইভ্যালুয়েটিং স্পেশাল ভেরিয়াবিলিটি অব কমার্শিয়ালি হারভেস্টেড ম্যাঙ্গোজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনেও বলা হয়, আম পাকার সময়ে ভিন্নতার ক্ষেত্রে জাতের চেয়ে ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত পার্থক্যই প্রভাব ফেলে সবচেয়ে বেশি। গবেষকরা দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আম উৎপাদনকারী এলাকাগুলোকে চারটি জোনে ভাগ করা হয়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলাকে জোন-১ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। জোন-২ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যশোর, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, খুলনা ও চুয়াডাঙ্গা জেলাকে। নাটোর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকে জোন-৩ এবং নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলাকে জোন-৪ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গবেষণায় উঠে আসে, জোন-১-এর জেলাগুলোয় আম সবার আগে পাকে। আর সবচেয়ে পরে পাকে জোন-৪-এর জেলাগুলোয়।

এসব জোনের কোনটিতে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কেমন হবে তা এখনো নিশ্চিত নন আবহাওয়াবিদরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা ও আবহাওয়াবিদ ড. মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়টির চরিত্র কেমন হবে তা বলা যাচ্ছে না। কোনো মডেলে দেখা যাচ্ছে, এটি মিয়ানমারে আঘাত হানবে। আবার কোনোটায় দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রামে আঘাত হানবে। বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। ঘূর্ণিঝড় হওয়ার পরে দিক পরিবর্তন করতে পারে আবার শক্তি সঞ্চয় করে গতি পরিবর্তন করতে পারে। ৭ মে সৃষ্টি হলে এটি ১৩-১৫ মের দিকে আঘাত হানতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’ তথ্য মতে, দেশে প্রায় ৫০০ জাতের আম উৎপাদন হয়। এর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে সাত জাত সবচেয়ে বেশি চাষ হয়ে থাকে। সেগুলো হলো ক্ষীরসাপাতি, ল্যাংড়া, ফজলি, বারি আম-২, বারি আম-৩, বারি আম-৪ ও হাঁড়িভাঙ্গা।

এমন আরো সংবাদ

Back to top button