হিরো অফ দি ডে

নারী হকিতে নতুন আলোর দিশা রিতু

বিকেএসপিতে প্রধান হকি মালয়েশিয়ান কৃষ্ণমুর্তির সামনে কোচিংয়ের বাশি রিতুর হাতে তুলে দিচ্ছেন তারিকউজজামান নান্নু/সংগৃহীত
বিকেএসপিতে প্রধান হকি মালয়েশিয়ান কৃষ্ণমুর্তির সামনে কোচিংয়ের বাশি রিতুর হাতে তুলে দিচ্ছেন তারিকউজজামান নান্নু/সংগৃহীত

আশির দশকে নারী হকির যাত্রা শুরু হলেও ধারাবাহিকতা ছিল না। আনুষ্ঠানিক ও পেশাদার আঙ্গিকে নারী হকির পথচলা শুরু মাত্র বছর দুয়েক। এর মধ্যে নারী হকি দলের অধিনায়ক রিতু খানম নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন।

বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) ‘প্রমীলা খেলোয়াড় অন্বেষণ’ কর্মসূচি শুরু করছে। এই কর্মসূচিতে তাকে চুক্তিভিত্তিক কোচ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিকেএসপির প্রথম নারী কোচ হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন রিতু খানম। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত, ‘এক সপ্তাহের বেশি হলো আমি বিকেএসপির হয়ে কাজ শুরু করেছি। এখনো অনেকটা ঘোরের মধ্যে আছি। আমি এত অল্প দিনে এত সুন্দর সুযোগ পাব ভাবিনি।’

২০১৪ সালে অ্যাথলেটিকসে এক মাসের প্রশিক্ষণ নিতে বিকেএসপিতে এসেছিল রিতু। প্রশিক্ষণ শেষে বিকেএসপিতে ভর্তির জন্য মনোনীতও হন। তবে বাঁধ সাধেন তার বাবা-মা। তারা রাজি না হওয়ায় আর বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়া হয়নি তার। সেই রিতুই এখন আগামীর নারী হকি খেলোয়াড় বাছাই করবেন।

রিতু ২০১৯ সালে সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দলের অধিনায়কত্ব করেছেন। খেলার পাশাপাশি তিনি কোচিং সনদও নিয়েছেন, ‘আমি লেভেল-১ সম্পন্ন করেছি। দুই প্রক্রিয়াধীন রয়েছে’-বলেন রিতু।

বিকেএসপির কোচিং প্রকল্পে প্রবেশ করলেও তার মূল মনোযোগ খেলাতেই, ‘বাংলাদেশের নারী হকিকে আমার অনেক কিছু দেয়ার আছে। আমি অনেক দিন খেলতে চাই। খেলার পর আনুষ্ঠানিকভাবে কোচিং করাব। এর আগে এই অভিজ্ঞতা আমাকে অনেক কাজে দেবে।’

চুক্তিভিত্তিক কয়েক মাসের প্রকল্পের নিয়োগ হওয়ায় সম্মানীর অঙ্কও বেশ ভালো। মাসিক ৫০ হাজার টাকা পাবেন রিতু। দ্বিতীয় বর্ষের একজন শিক্ষার্থীর জন্য যেটা যথেষ্টের চেয়েও অনেক বেশি। সব কিছুর জন্য রিতু সাবেক হকি খেলোয়াড় ও ক্রীড়া পরিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তারিকউজ্জামান নান্নুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন, ‘আমার আজকের এই অবস্থান ও সুযোগ পাওয়ার পেছনে মূল অবদান নান্নু স্যারের। তার সহযোগিতা এবং নির্দেশনা না থাকলে এই জায়গায় আমি আসতেই পারতাম না। শুধু আমি নই, বাংলাদেশের হকিতেই তার অবদান অতুলনীয়।’

২০১৮ সালে নারী হকি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেন তারিকউজ্জামান। নিজে ক্রীড়া পরিদপ্তরে চাকুরি করলেও দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসার জায়গা থেকে নারী হকি নিয়ে কাজ করে চলছেন তিনি। ক্রীড়া পরিদপ্তর ২০১৭ সালে দেশের প্রতিভাবান নারী হকি খেলোয়াড়দের জন্য মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে আবাসিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। ক্রীড়া পরিদপ্তর পরপর তিন বছর মেয়েদের জন্য আবাসিক হকি প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ঢাকা জেলা ক্রীড়া সংস্থার আমন্ত্রণে কলকাতা ওয়ারিয়ার্স প্রথম বিদেশি নারী দল হিসেবে খেলতে আসে। এর সব কিছুর উদ্যোক্তা ও তত্ত্বাবধানে ছিলেন নান্নু। করোনাকালে নারী হকি খেলোয়াড়দের ফিটনেস ঠিক রাখতে অনলাইনে নিয়মিত ক্লাস নিয়েছেন তিনি। অনেক সময় দেশের শীর্ষ হকি কোচ কাওসার আলীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন টেকনিক্যাল সেশনের জন্য। নান্নুর পরিকল্পনায় ক্রীড়া পরিদপ্তর হকির একটি বিশেষ প্রকল্প করছে ‘ফ্লিক’।

রিতু বিকেএসপির প্রকল্প কোচ হিসেবে যোগদান করায় খানিকটা তৃপ্ত নান্নু, ‘একটি স্বপ্ন ও লক্ষ্য নিয়ে মহিলা হকিতে কাজ শুরু করেছিলাম। রিতু অত্যন্ত মেধাবী খেলোয়াড়। রিতু বিকেএসপিতে কোচ হিসেবে যাত্রা শুরু করায় খুবই ভালো লাগছে।’

স্কুল জীবনেই রিতুর প্রথম স্টিক বলের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠে। নড়াইল জেলা ক্রীড়া অফিসের হকি প্রশিক্ষণে অংশ নেন রিতু। নড়াইল লোহাগড়া পাইলট স্কুলের শারীরিক শিক্ষক দিলীপ চক্রবর্তী ও সুজিত সিংহ রায় রিতুকে প্রথম হকি খেলা শেখান। এরপর যশোরের হকি কোচ হাসান রনির কাছে রিতুর হকি প্রশিক্ষণের সুযোগ হয়। জেলা স্টেডিয়ামে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের আয়োজন হয়। রিতুর বাড়ি থেকে লোগাগড়া বাস স্ট্যান্ডের দূরত্ব ২ কিলোমিটার, পায়ে হেটে সেখান থেকে লোকাল বাসে করে পৌঁছাতেন নড়াইল বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্টেডিয়ামে। এভাবেই প্রতিদিন রিতু লোগাগড়া উপজেলা থেকে নড়াইল স্টেডিয়ামে যেয়ে প্র্যাকটিস করেছেন।

এলাকার মুরব্বিরা খেলার পোষাক ও খেলার বিষয়ে বাড়িতে এসে রিতুর বাবা-মাকে কথা শোনাতেন। তখন বাবা-মা বাসায় বন্দি করে রাখতেন, বের হতে দিতেন না। এতসব বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে হকি খেলা শেখার অদম্য ইচ্ছা থেকে কেউ তাকে বিচ্যুত করতে পারেনি। লক্ষ্যটাকে ঠিক রেখে মনের জোরে এগোতে হয়েছে রিতুকে।

নব্বইয়ের দশকে জনপ্রিয়তার দিক থেকে ফুটবলের পরেই ছিল হকির অবস্থান। নানা সংকট ও সমস্যায় দেশের হকি এখন আগের সেই জায়গায় নেই। পুরুষদের হকি এখন ঘোর সংকটে। নারী হকি তো সেখানে রীতিমতো বাহুল্যই। এরপরও রিতু খানমের এমন অর্জন ও নান্নুর নিবেদন নারী হকির আলোর দিশারী হিসেবে কাজ করেছে।

ভালো সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন

এমন আরো সংবাদ

Back to top button