অর্থনীতিহাইলাইটস

মিয়ানমার সংকটে জাপানের ভূরাজনৈতিক বিনিয়োগের বড় গন্তব্য বাংলাদেশ

 মিয়ানমার সংকটে জাপানের ভূরাজনৈতিক বিনিয়োগের বড় গন্তব্য বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটির অবকাঠামো খাতে চীনের বিনিয়োগ বেড়েছে। দেশটিতে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পর্যবেক্ষকদের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। যদিও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির উন্নয়ন অবকাঠামো খাতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী দেশ জাপান। শুধু ভিয়েতনাম নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব দেশেই উন্নয়ন অবকাঠামোসহ নানা খাতে চীনের চেয়ে জাপানের বিনিয়োগ অনেক বেশি। সর্বশেষ কভিড মহামারীর প্রেক্ষাপটে অঞ্চলটিতে দুই দেশের বিনিয়োগ ব্যবধান আরো বেড়েছে। ফিচ সলিউশনসের তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের চলমান প্রকল্পগুলোয় চীনের মোট বিনিয়োগ ১৫ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। দেশগুলোয় জাপানি অর্থায়নে প্রকল্প চলমান রয়েছে ২৫ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের।

চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো দক্ষিণ এশিয়ায়ও আর্থিক সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে জাপান। এ অঞ্চলে প্রচুর উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে এসেছে টোকিও। তবে এখানকার দেশগুলোর মধ্যে এখন বাংলাদেশেই জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশও জাপানকে দেখছে সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে। দেশের উন্নয়ন অবকাঠামোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য, জ্বালানি, বাণিজ্য, বন্দরসহ নানা খাতেই জাপানি বিনিয়োগ দিন দিন বাড়ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে উপস্থিতির কারণে জাপানের কাছে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। একই কারণে একসময় জাপানের বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যস্থল হয়ে উঠেছিল প্রতিবেশী মিয়ানমারও। যদিও চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে অন্য অনেক দেশের মতো মিয়ানমার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে জাপানও।

গত দশকের শুরুর দিকে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক উত্তরণ শুরু হয়। একই সঙ্গে দেখা দেয় অর্থনীতির স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী দেশ হিসেবে মিয়ানমার পরিচিতি পায় এশিয়ার ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ হিসেবে। দেশটিতে বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসতে থাকে বিদেশীরা। এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকায় ছিল জাপান। যদিও শেষ পর্যন্ত সে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি মিয়ানমার। জাতিগত বিরোধপূর্ণ দেশটির পরিস্থিতি একপর্যায়ে ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে সামরিক জান্তার ক্ষমতা দখল ও এর ধারাবাহিকতায় চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেশটির যাবতীয় সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বিনষ্ট করে দিয়েছে। দেশটি থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে থাকে বিদেশীরা। যেকোনোভাবে হোক বিদ্যমান বিনিয়োগ তুলে নিতে চাইছে তারা। জাপানি বিনিয়োগকারীরাও চাইছে মিয়ানমার থেকে বিদায় নিতে। এর পরিবর্তে জাপানিদের কাছে এ অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় গন্তব্য।

এছাড়া শ্রীলংকার মতো দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কয়েকটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থানও বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে বেশ গুরুত্ববহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু দেশগুলো এরই মধ্যে চীনা প্রভাববলয়ে ঢুকে পড়েছে। এসব দেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে জাপানের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিক থেকেও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা সবচেয়ে বেশি। চতুর্দেশীয় জোট (অস্ট্রেলিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত) কোয়াডের সদস্য হিসেবে চীনকে অর্থনৈতিকভাবে মোকাবেলায় এ অঞ্চলে সক্রিয়তা বাড়িয়ে তুলেছে টোকিও। দক্ষিণ এশিয়ায় কোয়াডভুক্ত ভারতের বাইরে বাংলাদেশকেই এ সক্রিয়তা বাড়ানোর উপযুক্ত ও সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে জাপান। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গেটওয়ে হিসেবে দেশটির বিনিয়োগকারীদের কাছে দিনে দিনে আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ।

আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন সহযোগিতা (ওডিএ) কর্মসূচির আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন সহযোগিতা দিয়ে আসছে জাপান। বর্তমানে জাপানি ওডিএর সবচেয়ে বড় গন্তব্য বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে জাপানের মোট সহযোগিতার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪২৫ কোটি ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরেও দেশটির কাছ থেকে আরো ২৬৩ কোটি ডলারের বেশি অর্থ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছে। গত বছরের আগস্টে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সঙ্গে সরকারের একটি চুক্তি হয়। এখন পর্যন্ত ওডিএ কর্মসূচির আওতায় এটিই জাপান-বাংলাদেশের বৃহত্তম ঋণ চুক্তি, যার পরিমাণ প্রায় ৩২০ কোটি ডলার। জাইকার মাধ্যমে সাতটি সরকারি প্রকল্পে এ অর্থ ঋণ দিচ্ছে জাপান। অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর তুলনায় বেশ শিথিল শর্তেই বাংলাদেশকে ঋণ দিয়ে থাকে জাপান। বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সাম্প্রতিক স্বাক্ষরিত ঋণ চুক্তিগুলোয় সুদহার ধরা হয়েছে দশমিক ৬৫ শতাংশ। পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ বছর। এর সঙ্গে গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে ধরা হয়েছে আরো ১০ বছর।

আগামী বছরেই বাংলাদেশ ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। একই বছরে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উদ্বোধন হওয়ার প্রত্যাশা ছিল সংশ্লিষ্টদের। তবে শেষ পর্যন্ত বন্দরটির নির্মাণকাজ শেষের অনুমিত সময় ধরা হয়েছে ২০২৬ সাল। জাপানি অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতায় নির্মীয়মাণ সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি অর্থায়ন করছে জাইকা। বন্দরটি নির্মাণ হচ্ছে জাপানের কাশিমা ও নিগাতা বন্দরের আদলে। শুরুতে শুধু মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনা করা হলেও পরে তা সংশোধন করে এটিকে পূর্ণাঙ্গ গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। দেশের প্রথম এ গভীর সমুদ্রবন্দরকে জাপানিরা দেখছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যকার যোগসূত্র স্থাপনকারী বন্দর হিসেবে। জাপানি কূটনীতিকদের বিভিন্ন সময়ে দেয়া বক্তব্যেও বিষয়টি উঠে এসেছে।

জাপানি বিনিয়োগে বাস্তবায়নাধীন আরেকটি মেগা প্রকল্প হলো রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প। প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকায় নির্মীয়মাণ প্রকল্পটিতে জাইকার অর্থায়ন ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে লক্ষ্যের চেয়েও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে টার্মিনালটির নির্মাণকাজ। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৩ সালের জুনেই এটি উদ্বোধন করা সম্ভব হবে।

রাজধানীর সড়ক অবকাঠামোয় চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে জাপানি বিনিয়োগ। ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল প্রকল্পে (এমআরটি ৬) জাইকার বিনিয়োগ ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। হেমায়েতপুর-ভাটারা পর্যন্ত মেট্রোরেল (এমআরটি ৫) নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে আগামী বছর। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকা দিচ্ছে ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। আগামী মার্চে শুরু হচ্ছে ঢাকার পাতাল রেল নির্মাণ প্রকল্পের কাজ। এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এ মেট্রোরেল প্রকল্পের মোট খরচ ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এ প্রকল্পেও প্রধান অর্থায়নকারী জাইকা।

এছাড়া দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর মেগা প্রকল্পগুলোতেও বড় বিনিয়োগ রয়েছে জাইকার। যমুনা নদীর ওপর ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি টাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলসেতুটি। প্রকল্প ব্যয়ের ৭২ দশমিক শতাংশ বা ১২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা ঋণসহায়তা দিচ্ছে জাইকা। পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় সেতু অবকাঠামো নির্মাণে চলমান ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্টের মোট ব্যয় ১ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকার অর্থায়ন ১ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। আন্তঃসীমান্ত সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে গৃহীত ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্টের অনুমিত ব্যয় ৩ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকার মধ্যে সংস্থাটি দিচ্ছে ২ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা।

আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রভাব যাই হোক না কেন, সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ধারা অব্যাহত রাখাই বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক হবে বলে মনে করছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ছে। সামনের দিনগুলোয় এ সক্ষমতা আরো বাড়বে। এক্ষেত্রে আমাদের কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। এক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা হতে হবে এমন, আমরা সবার সঙ্গেই কাজ করব। যেখানেই যার সঙ্গে কাজ করলে আমাদের সুবিধা হবে, যাদের বিনিয়োগ আমাদের প্রয়োজনের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ হবে, আমরা তাদের সঙ্গেই কাজ করব।

২০৩০ সালের মধ্যে সারা দেশে জিটুজি ভিত্তিতে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কয়েকটি দেশের কাজও শুরু করেছে। বাস্তবায়ন অগ্রগতি বিবেচনায় এর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে জাপানের বিনিয়োগকারীদের জন্য জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল। আগামী বছরেই নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে নির্মাণাধীন অঞ্চলটিতে বেশকিছু শিল্প স্থাপনের কাজও সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।

জাপান সরকার জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের জন্য ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন প্রজেক্টের আওতায় ১৩ কোটি ৫৩ লাখ ১০ হাজার ডলার সহায়তা দিয়েছে। এ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে সরকার প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এছাড়া জাইকার আরো ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্য অনুযায়ী, জিটুজি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নাধীন জাপানের অর্থনৈতিক অঞ্চলটির ১ হাজার একরে অন্তত ১০০টি জাপানি কোম্পানি বিনিয়োগ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। চলতি বছর ডিসেম্বরের মধ্যেই এক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।

দেশে আরো বিপুল পরিমাণে জাপানি বিনিয়োগ আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম।  তিনি বলেন, জাপানের মোট বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক, এর সামান্য অংশও যদি পেতাম তাহলে বাংলাদেশের বিদেশী বিনিয়োগ অনেক বেড়ে যেত। অর্থাৎ জাপানের বিদেশী বিনিয়োগের তেমন বড় কোনো অংশ বাংলাদেশে এখনো আসেনি। এ প্রেক্ষাপটেই জাপানের বিনিয়োগ নিয়ে আসার বিষয়ে আমরা বিশেষভাবে আগ্রহী। আর তাছাড়া জাপান খুব পরিচ্ছন্ন ব্যবসা করে, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পররাষ্ট্রনীতি সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। সেক্ষেত্রে এখানে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির কোনো প্রভাব থাকবে বলে আমি মনে করি না।

গত কয়েক বছরে দেশে জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জাপান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেআইটিও) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে বাংলাদেশে চালু জাপানি কোম্পানির সংখ্যা ছিল ৭০। এর প্রায় এক যুগের মাথায় (চলতি বছরের এপ্রিল) দেশে চালু জাপানি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে ৩২১টিতে দাঁড়িয়েছে বলে জাপান দূতাবাসের তথ্যে উঠে এসেছে। নামিদামি জাপানি কোম্পানিগুলো এখন বাংলাদেশে কারখানাও স্থাপন করছে। মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড হোন্ডা এরই মধ্যে কারখানা স্থাপন করেছে। এছাড়া দেশে ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের কারখানা ও বিপণন করছে এসিআই।

তামাকজাত পণ্য উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান জাপান টোব্যাকো সম্প্রতি আকিজ গ্রুপের তামাক ব্যবসা কিনে নেয়। এতে জাপানের কোম্পানিটি বিনিয়োগ করছে ১৪৭ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ ইস্পাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নিপ্পন স্টিল অ্যান্ড সুমিতমো মেটাল দেশীয় প্রতিষ্ঠান ম্যাকডোনাল্ড স্টিল বিল্ডিং প্রডাক্টসের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইস্পাত কারখানা করছে। এজন্য ১০০ একর জমি বরাদ্দের বিষয়ে বেজার সঙ্গে চুক্তিও করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকায় একের পর এক স্টোর খুলছে জাপানি পোশাকের ব্র্যান্ড ইউনিক্লো ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড মিনিসো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজের (জেবিসিসিআই) মহাসচিব তারেক রাফি ভুঁইয়া বলেন, জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহ দেখানোর যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী। বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু আয় আগের চেয়ে অনেক বেশি। মাথাপিছু আয়ে ভারতকে আমরা ছাড়িয়ে গেছি। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বড়। মাথাপিছু আয় ২ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেলে ভোক্তারা দ্রুত উন্নতি করে। এ কারণে ফুডস আইটেমসহ নানা ধরনের পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে।

এছাড়া বাংলাদেশের বড় যে অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে তার অনেকগুলো জাপান বিনিয়োগ করছে। এ বিনিয়োগগুলো বহুদিন ধরে থাকবে। এ কারণে জ্বালানি, অটোমোবাইলস, পরামর্শক কোম্পানিসহ বিভিন্ন কোম্পানি সেখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছে। একই সঙ্গে আগে থেকে যারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছিল, তারাও নতুন করে বিনিয়োগ করতে চায়।

এছাড়া দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও বড় অংশীদার হয়ে উঠেছে জাপান। জাইকার অর্থায়নে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গড়ে উঠছে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ৩৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটিতে জাইকার অর্থায়ন ২৯ হাজার কোটি টাকা। টোকিওভিত্তিক কোম্পানি জাপানস এনার্জি ফর আ নিউ এরার (জেরা) বিনিয়োগ পরিকল্পনায় এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে ঢাকার অদূরে মেঘনাঘাটে বাস্তবায়নাধীন রিলায়েন্স পাওয়ারের বিদ্যুৎ প্রকল্পের ৪৯ শতাংশ ও সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের ২২ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছে জেরা। এর বাইরেও দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আরো বাড়ানোর আগ্রহ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এর মধ্য দিয়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব বিস্তারকারী বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে জেরা।

ভালো সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন

এমন আরো সংবাদ

Back to top button