মতামত

তেলের দাম বৃদ্ধি বৈষম্য এবং কষ্ট বাড়াবে

রাজেকুজ্জামান রতন
রাজেকুজ্জামান রতন

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর একটি ঘোষণা অনেক ঘোষণার পথ তৈরি করে দিল। তেল বিক্রি করে সাত বছর ধরে লাভ করে মাত্র দুই মাস মূল্যবৃদ্ধি সহ্য করতে পারল না সরকার। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয় বাড়িয়ে দিল ডিজেল এবং কেরোসিনের দাম। অবশ্য দাম বাড়ানোর কথাটার সঙ্গে একমত হবেন না তারা। তারা বলবেন যে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। বৃদ্ধি বা সমন্বয় যাই হোক না কেন ঘোষণার আগে কারও সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সময় নষ্ট করেনি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বা সরকারের কোনো মহল। দেশে একটি সংসদ আছে যেখানে বিরোধিতা করার মতো সদস্য খুবই কম। সরকার নির্দ্বিধায় সেখানে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সংসদ হলো আইনসভা। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হোক বা না হোক, আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা সেখানে আছেন। সেখানে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে দাম বাড়ালে জনগণ খুশি হবেন কি না সে বিষয়টা আলোচনা করা হয়তো যেত। কিন্তু সেখানেও আলোচনার প্রয়োজনীয়তা মনে করেননি। বলা হলো, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য প্রতি লিটার ভোক্তাপর্যায়ে ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা পুনর্নির্ধারণ করেছে। সার্বিক পরিস্থিতি কী তা নিয়ে প্রশ্ন করলেও উত্তর দেওয়ার দায় কারও নেই। প্রসঙ্গত, গত সপ্তাহ থেকেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিপিসি বলছিল, তাদের লোকসান হচ্ছে তাই বারবার তাদের লোকসান কমাতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে চাইছিল জ্বালানি বিভাগে। অবশেষে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েই দিল বিপিসি।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বহুদিন নিম্নমুখী থাকার পর কয়েক মাস থেকে ঊর্ধ্বমুখী। ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে সময় ডিজেলের দাম ৬৫, কেরোসিনের দাম ৬৫, অকটেনের দাম ৮৯ ও পেট্রলের দাম ৮৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১৩ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেই যাচ্ছিল। একসময় সর্বনিম্ন ২০-২২ ডলারেও নেমে এসেছিল তেলের দাম। কিন্তু দেশে তেলের দাম কমেনি। বিপিসির কর্মকর্তারাই বলেছেন, ২০১৪ সালের পর সাত বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় এ সময় বিপিসি ৪০ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর জুন মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে থাকে এবং ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের বেশি হয়ে যায়। ফলে বিপিসি তেলে লোকসান শুরু করেছে গত অক্টোবরের শুরুর দিকে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘সবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে, তেলের এই দাম ঊর্ধ্বমুখীও থাকবে না। সরকারের উচিত হয়নি এর মধ্যে দাম বাড়ানোর। কারণ দেশের পরিবহনের বড় অংশই চলে ডিজেলে। পরিবহন খরচ এখন বাড়বে, এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়ে যাবে।’  তিনি আরও বলেন, ‘গত সাত বছরে তেল বেছে বিপিসি ৪০ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে, তখন সরকার তেলের দাম কমায়নি। উল্টো বিপিসিসহ জ্বালানি খাতের কোম্পানির কাছ থেকে এক লাখ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে দাম বাড়ানো অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে।’ আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশে পড়ে বিদ্যুৎগতিতে। আর দাম যদি বিশ্ববাজারে কমে তাহলে তার প্রভাবে দেশে পণ্যের দাম কমবে কচ্ছপ গতিতে।

বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। তাই বিশ্ববাজারের সঙ্গে সম্পর্ক খুব নিবিড়। প্রতি বছর দেশে জ্বালানি তেলের প্রয়োজন প্রায় ৬৫ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ টন ডিজেল। অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ ডিজেল, ১০. ৫ শতাংশ ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েল ৬.৫ শতাংশ, অকটেন ৪.৮ শতাংশ, পেট্রল ৪.৮৫ শতাংশ, কেরোসিন ১.৯ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। ডিজেল ব্যবহৃত হয় পরিবহনে বিশেষ করে ট্রাক, লরি, কাভার্ডভ্যানসহ ভারী যানবাহনে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে, সেচসহ কৃষিকাজে। ফলে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, পারিবারিক ব্যয় বৃদ্ধিসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে। পণ্য পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাক মালিকরা। এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর অজুহাতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। বুধবার রাত ১২টা থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরপরই এই রুটে যাত্রীবাহী বাসগুলোর ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জনপ্রতি ১৪ টাকা বেশি আদায় করছেন উৎসব, বন্ধনসহ বাসগুলোতে। এ ছাড়া শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস শীতল পরিবহনের ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ বা নন-এসি বাসের আগে ভাড়া ছিল ৩৬ টাকা। বর্তমানে ১৪ টাকা বাড়িয়ে ৫০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। উৎসব পরিবহনের কাউন্টার থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে তেলের দাম বাড়ানোর কারণে মালিকপক্ষের নির্দেশে তারা ৫০ টাকা ভাড়া আদায় করছেন। ফলে নতুন ভাড়া নেওয়ার সময় যাত্রীদের সঙ্গে ঝগড়া হচ্ছে। কিন্তু যাত্রীরা তো অসহায়, তাদের যেতেই হবে বেশি ভাড়া দিয়ে হলেও। বন্ধন পরিবহনও ভাড়া বাড়িয়ে ৫০ টাকা আদায় করছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস শীতল পরিবহনের ভাড়া ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০ টাকা করা হয়েছে।

সরকার তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বাসভাড়া। কিন্তু কত বাড়বে বা কত বৃদ্ধি হওয়া উচিত তা দেখার বা বলার কেউ নেই। সারা দেশের সব রুটেই বাসভাড়া বাড়বে। তেলের দাম বাড়াল সরকার, মালিক বাড়াল বাসভাড়া, বিরোধ হবে যাত্রী আর পরিবহন শ্রমিকের মধ্যে, মূল্যবৃদ্ধির বোঝা বইবে সাধারণ জনগণ। সাধারণত প্রতি লিটার ডিজেলে কমপক্ষে তিন কিলোমিটার চলে একটি বড় বাস। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। তাহলে জ্যাম ও অন্যান্য বিবেচনায়ও সাত লিটারের বেশি ডিজেল লাগার কথা নয়। তেলের জন্য খরচ বাড়বে ১০৫ টাকা আর ১৪ টাকা করে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হলে ৪০ জন যাত্রীর কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হবে ৫৬০ টাকা। এভাবে পণ্য পরিবহনে, বিদ্যুতে, কৃষি উৎপাদনে বাড়তি খরচের বোঝা চাপবে সর্বংসহা জনগণের ওপর। কী আর করবেন তারা? একটাই পথ খাওয়া কমানো। শাসক দলের নেতারা বলবেন জনগণ তো মেনে নিয়েছেন কারণ দেখুন, কেউ তো প্রতিবাদ করছে না। আসলে দেশের মানুষের আয় অনেক বেড়ে গিয়েছে তো! তাই এই মূল্যবৃদ্ধিতে কোনো কষ্ট হবে না কারও। তেলের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এলপিজির সিলিন্ডারের দাম আবার বাড়ানো হয়েছে। প্রতি সিলিন্ডার ৫৪ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩১৩ টাকা। চার মাসে পাঁচবার গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধি ৪১ লাখ গ্রাহকের জীবনে দুর্ভোগ বাড়িয়েই চলেছে।

শুধু দাম বৃদ্ধি নয় আয় বৃদ্ধির নতুন সুখবরও জানানো হলো এরই মধ্যে। আমাদের মাথাপিছু আয় নাকি আড়াই হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে দেশের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৫৫৪ ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ২২৭ ডলার। নতুন হিসাবে মাথাপিছু আয় বেড়েছে আরও ৩২৭ ডলার। করোনায় মানুষ কাজ হারিয়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে কিন্তু মানুষের আয় বেড়ে যাওয়াকে কেউ ঠেকাতে পারে নাই। কিন্তু মাথাপিছু আয়ের হিসাব শুনে মাথা ঘুরে যাওয়ার উপক্রম হলেও পকেটে হাত দিয়ে মানুষ দেখছে টাকা নেই। কেমন করে আয় বেড়ে গেল এত? একটা কারণ সরকার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) হিসাব করার জন্য সম্প্রতি নতুন ভিত্তি বছর চূড়ান্ত করেছে। ২০১৫-১৬ ভিত্তি বছর ধরে এখন থেকে জিডিপি, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, মাথাপিছু আয় গণনা করা শুরু হয়েছে। এত দিন ২০০৫-০৬ ভিত্তি বছর ধরে মাথাপিছু আয় হিসাব করা হতো। ভিত্তি পাল্টানোর ফলে হিসাবে আয় তো বেড়ে গেল কিন্তু বাস্তবে কি বেড়েছে? হিসাব অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারে এখন মাসিক আয় ৯০ হাজার টাকার বেশি। দেশের ৬ কোটি ৮২ লাখ শ্রমজীবী, তিন কোটির ওপর কর্মক্ষম বেকার, এক কোটির ওপর বৃদ্ধ, চার কোটি ছাত্রছাত্রী এদের কার কার আয় বেড়েছে তা খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাহলে কিছু মানুষের আয় এত বেড়েছে যে গড় আয়ের হিসাবে বাংলাদেশ এখন নাকি ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে।

সাধারণ মানুষ টাকা পাচার করে না, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে না, সিন্ডিকেট করে জিনিসের দাম বাড়ায় না, মেগা প্রকল্পের নামে জনগণের ওপর ব্যয়ের বোঝা ছাপিয়ে দেয় না। তারা পরিশ্রম করে কৃষিতে, শিল্পে, সেবা খাতে। ট্যাক্স দেয়, ভ্যাট দেয়, অর্থনীতিকে সচল রাখে। তাদের শ্রমে জিডিপি বাড়ে, তাদের সন্তানরাই রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার পূর্ণ করে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আঘাত সহ্য করে কোনো মতে নিজেদের জীবন বাঁচিয়ে রাখে। তাদের সুরক্ষা দেওয়ার দায় কি রাষ্ট্র পালন করবে না? রাষ্ট্র এবং সরকার যদি এই দায়িত্ব পালন না করে জনগণকে শুধু মুনাফা অর্জনের ক্ষেত্র বানায় তাহলে তাকে জনগণের পক্ষের সরকার বলা যাবে না কোনো মতেই। তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নাকি দিনে ২০ কোটি টাকা লোকসান হয় বিপিসির। এই ভার বিপিসি বহন করতে পারছে না। লোকসানের খাতগুলো বন্ধ না করে লোকসানের অজুহাতে তেলের দাম বাড়িয়ে বহু গুণ ব্যয়ের বোঝা জনগণের ওপর চাপানোর এই নীতি বন্ধ হওয়া দরকার।

রাজেকুজ্জামান রতন

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

rratan. spb@gmail. com

ভালো সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন

এমন আরো সংবাদ

Back to top button