মতামত

এ কোন ছাত্র রাজনীতি?

 সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ‘হাড় নেই, চাপ দেবেন না’…. হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা তরুণের মাথায় ব্যান্ডেজ এবং তাতে এ কথা লেখা। ছবিটি ভাইরাল হয়েছে, কিন্তু যেখানে বড় পরিসরে আলোচনা হওয়া দরকার ছিল সেখানে নিরবতা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্র মাহাদী জে আকিব মৃত্যুর সাথে লড়ছেন। মা বাবা অনেক স্বপ্ন নিয়ে তাকে ডাক্তারি পড়তে পাঠিয়েছিল। যে ছেলের মাধ্যমে মানুষের জীবন বাঁচানোর স্বপ্ন দেখতেন বাবা-মা, তারা এখন প্রহর গুনছেন লাইফ সাপোর্ট থেকে তাদের ছেলে ফিরে আসার জন্য। ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে করোনার দীর্ঘ বিরতির পরপরই মেডিকেল কলেজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। সেই সংঘর্ষেই আহত হয়েছেন আকিব। রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি ছাড়া ছাত্র রাজনীতি হতে পারে, কিন্তু সেটার জন্য যে আন্তরিকতা রাজনৈতিক দলগুলোর থাকা দরকার সেটা নেই। রাজনীতি না থাকলে টাকার খেলাও কমবে। শিক্ষার পরিসরে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার খেলা চললে আকিবদের জীবন নিয়ে আজীবন শঙ্কা থাকবে মা-বাবাদের।

সংঘর্ষে জড়িত দুই পক্ষের একটি শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ও আরেকটি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। লাঠির আঘাতে আকিবের মাথার সমস্ত হাড়গুলি গুঁড়িয়ে যায়।

বিমর্ষ, বিপর্যস্ত, ছেলের জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তার মাঝে আকিবের মা প্রশ্ন রেখেছেন গণমাধ্যমের কাছে, ‘এ কেমন রাজনীতি’? আমরাও বলি – এ কেমন ছাত্রলীগ, এ কোন ছাত্র রাজনীতি? বুয়েটে আবরার হত্যা, সিলেট এম সি কলেজে ধর্ষণ কান্ড, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঁদাবাজি কান্ডসহ নানা কিসিমের কাজ হয় ছাত্রলীগের নামে। ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে যেসব বড় নেতা এসব করান তাদের কোথাও কোন জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নেই। কিন্তু এর কারণে ছাত্ররাজনীতির নামে প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের ছাত্র অশান্তি।

ছা ত্রদের মধ্যে মিছিলকরা ছাত্র যেমন থাকে, তেমনই নিশ্চিন্তে লেখাপড়া করতে চায় এমন ছাত্রও থাকে। কিন্তু সে সুযোগটাও নষ্ট হচ্ছে এমন এক বৈরি পরিবেশে। গোটা ছাত্রসমাজ একেবারে শান্ত-সুবোধ হয়ে থাকবে, শুধু পড়ালেখা করবে এমনটা কেউ বলছে না। কিন্তু এখন ছাত্র রাজনীতির নামে ক্যাম্পাসে যা হচ্ছে, যে জঙ্গিপনা, সহিংসতা, অসততা আর ঔদ্ধত্য দেখছি তাতে ভাবতেই হয় এমন রাজনীতির আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা।

রাজনৈতিক আদর্শে মতবিরোধ, সেটা থেকে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঐতিহ্য আছে আমাদের। কিন্তু এখন কোন আদর্শের বিরোধ নেই, কারণ সব ক্যাম্পাস সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের দখলে। এখন যা হয় সব নিজেদের মধ্যে, কোন বিরোধি দল নেই। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে স্থানে স্থানে সমাজ বিরোধীরা এলাকার দখল নিয়ে যে সংঘাতের খবর নিয়মিত আসে, ক্যাম্পাসের সংঘাতের চরিত্রও তারই মতো। ক্যাম্পাসের ক্ষমতার রাশটি কার হাতে থাবে, সে দ্বন্দ্বেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে বারবার। যে নেতারা বাইরে থেকে ইন্ধন দেন এসব গ্রুপিং-এ তাদের সন্তানরা এ দেশে পড়েন না। তাই তাদের ভাবনাও নেই।

ক্যাম্পাস দখলে রাখতে এত মরিয়া কেন তারা? উত্তর খুব সহজ – ক্যাম্পাসে টাকা উড়ে। ভর্তি বাণিজ্য, হলের সিট বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, ছাত্র সংগঠনের পদ বাণিজ্য – সবকিছুতে প্রভূত পরিমাণ টাকা। সেই টাকায় অধিকার কায়েম করবার একমাত্র উপায় ক্যাম্পাসের ক্ষমতা কুক্ষিগত করা। অতএব তারা সে পথেই চলছেন। বড় বড় জাতীয় নেতারা যদি ছাত্রসমাজের এই সহিংস শৃঙ্খলাহীনতাকে প্রশ্রয় দেন তাহলে যেটা হবার এখন আসলে সেটাই হচ্ছে এবং জাতির জীবন থেকে লেখাপড়া সরে যাওয়া অনিবার্য হয়ে উঠছে।

আবরার মারা গেছেন। আকিব মারা যেতে পারেন। কোনও ভাবনা নেই কোথাও। রাজনৈতিক নীতি নির্ধারকরা কেনই বা ভাববেন এসব নিয়ে? কি আসে যায় মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র পরিবারের সন্তান মরলে? যারা ভবিষ্যতে চিকিৎসক হবে তারাও যদি বন্দুক, লাঠি, ছুরি, রাম দা নিয়ে সতীর্থদের ওপর চড়াও হতে পারেন, তাহলে এখনকার সামগ্রিক ছাত্ররাজনীতির দর্শনটা তো পরিষ্কারই আমাদের সামনে।

সমাধান কী? সোজাসাপ্টা সমাধান হলো এখন যেভাবে চলছে সেটা হতে না দেওয়া আর সে জন্য আপাতত ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ রাখা। যদি ছাত্ররাজনীতি রাখতেই হয় তাহলে জোরেশোরে নামতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ছাত্র-রাজনীতির সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটানোর জন্য। না হলে কিছুই হবে না। আরও প্রাণ যাবে, আরও ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটবে, আরও টেন্ডারবাজি হবে।

যারা এসব কান্ড করে তারাই কিন্তু আমাদের ভবিষ্যত জাতীয় নেতা। তাহলে আগামী দিনগুলো আমাদের জন্য কত ফকফকা নিশ্চয়ই সেটা বুঝতে আসুবিধা হচ্ছে না। যারা সহিংসতা করে, সমাজবিরোধী কাজ করে তারা কেন করে? কারণটি সহজবোধ্য। ক্যাম্পাসে যে ছাত্ররা আইন ভাঙছে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তারা খুব ভাল করে জানে তাদের কোন বিপদ নেই। যদি বিপদ হয়ও তাহলে উদ্ধার করবার ব্যবস্থা আছে। তাদের লোক আছে, সংগঠন থেকে বহিষ্কার নামের নাটক আছে। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ কর্তৃপক্ষ কিছুই করতে পারবে না, পুলিশ বা প্রশাসনও তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করবার সাহস দেখাবে না। পেছনে রাজনৈতিক বড় নেতাদের সমর্থন না থাকলে এই ছাত্ররা প্রশাসনকে হয়তো সমঝে চলতো।

আরেক সমস্যা শিক্ষকদের রাজনীতি। নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাদেরও কোন বল নেই, সাহস নেই। রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি ছাড়া ছাত্র রাজনীতি হতে পারে, কিন্তু সেটার জন্য যে আন্তরিকতা রাজনৈতিক দলগুলোর থাকা দরকার সেটা নেই। রাজনীতি না থাকলে টাকার খেলাও কমবে। শিক্ষার পরিসরে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার খেলা চললে আকিবদের জীবন নিয়ে আজীবন শঙ্কা থাকবে মা-বাবাদের।

লেখক : প্রধান সম্পাদক. জিটিভি।

ভালো সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন

এমন আরো সংবাদ

Back to top button