অর্থনীতি

জ্বালানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সমৃদ্ধ করছে সরকারি কোষাগারও

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড

852দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই লোকসানি হিসেবে পরিচিত। বছর বছর সরকারকে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বড় অংকের অর্থ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তবে এর কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। এমনই এক ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র পেট্রোলিয়াম পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। একদিকে পরিশোধনের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে লাভজনক কোম্পানি হিসেবে প্রতি বছরই সরকারি কোষাগারে যুক্ত করছে মুনাফার ভাগ। স্বাধীনতা পর থেকেই দেশের জ্বালানি খাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীতীরে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি।

যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার অন্যতম একটি মানদণ্ড হলো সে দেশের জ্বালানি উৎপাদন বা পরিশোধন কার্যক্রম। ১৯৬৮ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া ইআরএল একসময় দেশের জ্বালানি চাহিদার ৭৫ শতাংশ পূরণ করেছে। বর্তমানে জ্বালানি খাতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো ও শক্তিশালী। তার পরও এখনো দেশের ২৫ শতাংশ জ্বালানি চাহিদা পূরণ করছে ইআরএল। গ্যাসক্ষেত্রের কনডেনসেট ও আমদানীকৃত অপরিশোধিত জ্বালানির উপজাত থেকে বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য তৈরির পাশাপাশি উন্নতমানের বিটুমিন, জুট ব্যাচিং অয়েলসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে এখনো শীর্ষে ইআরএল।

দেশে পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ইস্টার্ন রিফাইনারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রতিষ্ঠানটির কল্যাণে বর্তমানে বাংলাদেশকে জ্বালানিসংক্রান্ত কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভর করতে হয় না। রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি বিপণনকারী সংস্থা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ছাড়াও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের মানমাত্রা পরীক্ষার জন্য ইস্টার্ন রিফাইনারির ওপর নির্ভরশীল।

তবে ইস্টার্ন রিফাইনারি মূলত বিপিসির আমদানীকৃত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাত করে। বিপিসির আমদানীকৃত সৌদি আরবের অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড (এএলসি) ও দুবাইয়ের মারবান ক্রুড প্রক্রিয়াকরণসহ প্রায় ১৬ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর পরিশোধিত জ্বালানি তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয় বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েলের কাছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সঙ্গে সংমিশ্রণ হিসেবে থাকা কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাতও করে প্রতিষ্ঠানটি। বছরে প্রায় এক লাখ টন কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে ইআরএল। এ কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। এরপর তা সরবরাহ করা হয় বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডকে। এছাড়া আমদানীকৃত মোটর গ্যাসোলিন ও ডিজেল প্রয়োজনীয় ব্লেন্ডিং শেষে তা মোটর স্পিড ও হেভি স্পিড ডিজেল হিসেবে বিপণন কোম্পানিগুলোকে সরবরাহ করে ইআরএল।

সব মিলিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের মধ্যে রয়েছে আরজি (রিফাইনারি গ্যাস), এলপিজি, এসবিপি (স্পেশাল বয়েলিং পয়েন্ট) সলভেন্ট, এমএস (মোটর স্পিরিট), ন্যাপথা, এসকেও (সুপিরিয়র কেরোসিন অয়েল), এমটিটি (মিনারেল টারপেনটাইন জেপি-১), জেবিও (জুট ব্যাচিং অয়েল), এইচএসডি (হাইস্পিড ডিজেল), এলএসডিও (লো সালফার ডিজেল অয়েল), এইচএসএফও (হাই সালফার ফুয়েল অয়েল), এলএসএফও (লো সালফার ফারনেস অয়েল) ও বিটুমিন।

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ইস্টার্ন রিফাইনারির অবদান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. লোকমান হোসেন বলেন, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশের স্মারক শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ইআরএল ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিশোধিত জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ করে গিয়েছে ইআরএল। পাশাপাশি ইআরএলের পণ্য দেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের মানদণ্ড হিসেবেও। জ্বালানি খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ ক্রমাগত বাড়লেও এখনো এসব পণ্যের বাজারে ভারসাম্য ধরে রাখায় ভূমিকা রাখছে ইআরএল।

সংস্থাটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে ইআরএল নতুন একটি প্লান্ট স্থাপন প্রকল্পের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। বর্তমানে বার্ষিক ১৫ লাখ টন জ্বালানি পরিশোধন করলেও দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে উৎপাদন উন্নীত হবে ৪৫ লাখ টনে। দেশে বর্তমানে জ্বালানির বার্ষিক চাহিদা ৬০-৬৫ লাখ টন। দ্বিতীয় প্লান্ট চালু হলে স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ করতে সক্ষম হবে ইআরএল।

ইস্টার্ন রিফাইনারির যাত্রা স্বাধীনতারও আগে, ১৯৬০ সালে। সে সময় পাকিস্তানি উদ্যোক্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্যোগে একটি প্রকল্প আকারে জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার হিসেবে স্থাপন করা হয় প্রতিষ্ঠানটি। এর তিন বছর পর ১৯৬৩ সালে ওই সময়ের প্রচলিত কোম্পানি আইন অনুযায়ী পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় ইআরএল। ১৯৬৬ সালে যুক্তরাজ্যের বার্মা অয়েল কোম্পানির (বিওসি) সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু করে। এ সময় তিনটি ফরাসি কোম্পানি টেকনিপ, এনসা ও কফ্রির সঙ্গে টার্ন-কি চুক্তি স্বাক্ষর করে ইস্টার্ন রিফাইনারি। পরিশোধনাগার স্থাপন সম্পন্ন হয় ১৯৬৭ সালে। এর পরের বছরই ১৯৬৮ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির এক আদেশের ভিত্তিতে ইস্টার্ন রিফাইনারিকে জাতীয়করণ করা হয়। সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জ্বালানি, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (বিএমওজিসি) অধিভুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পেট্রোবাংলা। ওই সময় ইআরএল পেট্রোবাংলার অধিভুক্ত হয়। এর তিন বছর পর ১৯৭৭ সালে সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ইআরএলের ৭০ শতাংশ শেয়ার ন্যস্ত করা হয়। ওই সময় থেকেই বিপিসির সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালু রয়েছে ইআরএল। সে সময় বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতির আওতায় বাকি ৩০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা দেয়া হয়েছিল ব্রিটিশ কোম্পানি বিওসিকে। ১৯৮৫ সালে বিওসি নিজ মালিকানার সব শেয়ার বিপিসির কাছে বিক্রি করে দেয়। এতে ইস্টার্ন রিফাইনারির শতভাগ মালিকানা চলে যায় বিপিসির হাতে। স্বল্পমূল্যের ফার্নেস অয়েল থেকে উচ্চমূল্যের ডিজেল তৈরির জন্য ১৯৯৫ সালে একটি সেকেন্ডারি কনভারসন প্লান্ট (এসসিপি) স্থাপন করে ইআরএল। এটি ইস্টার্ন রিফাইনারির সবচেয়ে বড় প্রকল্প। জ্বালানি পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে এর পরেও আরো নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে ইআরএল।

বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির মোট উৎপাদন সক্ষমতা বার্ষিক ১৫ লাখ টন। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে কভিডের কারণে প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। ওই সময় ১০ লাখ ৭৮ হাজার ৫৭০ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য প্রক্রিয়াজাত করেছে ইআরএল।

কোম্পানিটির গত পাঁচ বছরের আর্থিক ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রক্রিয়াকরণ বাবদ ১৪৫ কোটি টাকা আয় করেছিল কোম্পানিটি। এরপর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৮৪ কোটি, ২০৭-১৮ অর্থবছরে ১৬২ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৯৩ কোটি টাকা আয় হয়েছে ইআরএলের। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাত থেকে কোম্পানিটির মোট আয় হয়েছে ১৬৫ কোটি টাকা। আয়ের বিপরীতের বছর শেষে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মুনাফাও অর্জন করেছে কোম্পানিটি। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১১ কোটি, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮ কোটি ৪৪ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ কোটি ৪৬ লাখ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে কোম্পানিটির। আয়কর, মূসক ও ঋণের সুদ বাবদ ২০১৯-২০ অর্থবছরে কোম্পানিটি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ১৮৫ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। ওই সময় ইআরএলের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৩৫ টাকা ৫৫ পয়সা করে।

ভালো সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন

এমন আরো সংবাদ

ভালো সংবাদ
Close
Back to top button