আপনি জানেন কি?মতামত

উধাম সিং মানুষের মনে চিরঞ্জীব

উধাম সিং ( Udham Singh) পাঞ্জাবের অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ অনেকেই প্রতিবাদ করেছিলেন ।। কিন্তু  উধাম সিং এর   প্রতিবাদ ইতিহাসে এবং জনসংস্কৃতিতে ভিন্ন ভাবে স্থান পেয়েছে ।  জালিয়ানোয়ালাবাগ ম্যাসাকার ” সঙ্ঘঠিত হয় ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল । তখন পাঞ্জাবের গভর্নর ছিলেন মাইকেল ও’ ডাইয়ার ( O ‘ Dwyer ) । তাঁরিই নির্দেশে প্রায় এক হাজারের বেশি নিরপরাধ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা  এবং বহুজনকে হতাহত করা হয় । প্রায় বিশ বছর পর এই হত্যার মুল হোতা ও’ ডাইয়ার কে লন্ডনে গুলি করে হত্যা করেন উধাম সিং।
২৬ শে ডিসেম্বর ১৮৯৯ সালে পাঞ্জাবের সাংরুর ( sangrur ) জেলায় দরিদ্র দলিত পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন উধাম  সিং । অল্প বয়সে পিতামাতাকে হারিয়ে এতিম খানায় পড়াশুনা শুরু করেন ।  প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ আর্মির পক্ষে একজন কায়িক শ্রমিক হিসেবে যোগ দেন । ১৯১৯ সালে যুদ্ধ শেষে ভারত ফিরে এসে উধাম সিং এর বিপ্লবী জীবনের শুরু হয় । প্রায় দুই দশকের বিপ্লবী জীবনে তিনি বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিলেন । যেমন উদে সিং । আর একটি নাম ছিল মোহাম্মদ সিং আযাদ । তিনি  হিন্দু , মুসলিম , শিখ সকলকে একসাথে নিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে  ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন । প্রায় চারটি উপমহাদেশের বিশটি শহরে ব্যাপ্ত হয়েছিল তার কর্মকাণ্ড ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে মেসোপটেমিয়া থেকে ফিরে উধাম সিং গদর পার্টির ( Ghadar Party  ) সাথে সম্পর্কিত হন । এই পার্টি সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শ দাঁরা প্রভাবিত ছিল । বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের জন্য ব্রিটিশরা যে সুযোগ সুবিধা প্রদানের কথা বলেছিলেন তা সবই প্রতারণাপূর্ণ । যুদ্ধ শেষে উধাম সিং প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন । ব্রিটিশদের প্রতারণা এবং জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড তাঁকে গদর পার্টিতে যুক্ত হতে উৎসাহিত করে । অন্যান্ন বিপ্লবীদের সাথেও তার পরিচয় হতে শুরু করে । তিনি বিপ্লবী সাইফুদ্দিন ( Saifuddin Kitchlew) এবং মাস্টার মোতা সিং এর সংস্পর্শে আসেন ।  পূর্ব আফ্রিকায় গদর পার্টির অনেকর সাথে তার সাক্ষাৎ হয় । ১৯২২ সালে তিনি অমৃতসরে ফিরে আসেন এবং একটি দোকান খুলে সেখান থেকে বিপ্লবী তৎপরতা শুরু করেন ।
১৯২৪ সালে উধাম সিং মেক্সিকো হয়ে সানফ্রানসিসকো আসেন । সানফ্রান্সসিকো ছিল গদর পার্টির এপিসেন্টার । এখান থেকেই ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী কাজ ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হয়  এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সদস্য ও অর্থ সংগ্রহ এবং জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির কাজ শুরু হয় । প্রায় তিন বছর তিনি সানফ্রানসিসকো , ডেট্রয়েট , শিকাগো ,নিউইয়র্কে অবস্থান করেন এবং গদর পার্টির  সহায়ক শক্তি হিসেবে আজাদ পার্টি গড়ে তোলেন । এমেরিকার পর তিনি জাহাজে কাজ নিয়ে ইউরোপ এবং মেডিটেরিনিয়ান ব্যাপক ভাবে ভ্রমন করেন  । ইউরোপের ইতালি ,জার্মানি , পোল্যান্ড , ইরান ,হংকং ,জাপান মালয়শীয়া ,সিংগাপুর ইত্যাদি শহরে গদর পার্টির সদস্যদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন । ভারতের স্বাধীনতার জন্য অর্থ সংগ্রহ ও জনমত গড়ে তোলা ছিল তাঁর ব্যাপক ভ্রমনের উদ্দেশ্য । এরপর তিনি দেশে ফিরে আসেন । গদর পার্টি ও কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সাথে ছিল সম্পর্কিত ।  এই সম্পর্কের ভিত্ততেই উধাম সিঙের রাজনৈতিক উত্থান ।
”অস্ত্র আইন ” ও রাজনৈতিক ইশতেহার বিলি করার সময় তিনি পাচ বছরের জন্য গ্রেফতার হন । জেলে তাঁর সাথে পরিচয় হয় অগ্নিযুগের   বিপ্লবী ভগৎ সিং এর ।। প্রবীণ এই স্বাধীনতা সংগ্রামী আর এক বিপ্লবী লালা লাজপত রায়ের হত্যার প্রতিশোধে এক ব্রিটিশ পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট মিস্টার স্যান্ডার্সকে (  J.P. Saunders ) গুলি করে হত্যা করেন এবং আইন পরিষদে বোমা হামলা করেন  । বিচারে ভগত সিং এর ফাঁসি হয় । জেলে এবং পরবর্তীতে এই  ভগত সিং ছিলেন উধাম সিং এর “গুরু ” ।।
১৯১৯ সালে জালিয়ানোয়ালাবাগ হত্যাযজ্ঞের প্রায় প্রায় ২০ বছর পর ১৯৪০ সালের ১৩ মার্চ লন্ডনের ক্যাক্সটন হলে ( Caxton Hall ) বক্তব্য রাখবেন মাইকেল ও ডাইয়ার ( Michael O’ Dwyer ) ।। উপস্থিত ছিলেন বাংলার প্রাক্তন গভর্নর লর্ড জেটল্যান্ড , বোম্বের প্রাক্তন গভর্নর লর্ড ল্যামিংটন , পাঞ্জাবের প্রাক্তন গভর্নর লুইস ডেন ।। প্রত্যেককেই গুলি করেন উধাম সিং ।। প্রত্যেকেই ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি ।। নিহত হন মাইকেল ও ‘ ডাইয়ার ।। ১৯৪০ সালের ৩১ শে জুলাই উধাম সিং এর ফাঁসী হয় ।।
 উপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ” চরমপন্থা ধারায় ” উধাম সিং এর চিন্তার বিকাশ ।। কিন্তু দেশপ্রেম ও পরাধীন মানুষের প্রতি তাঁর ভালবাসা প্রশ্নাতীত ।।  উধাম সিং ছিলেন একজন দলিত সম্প্রদায় ভুক্ত ,দরিদ্র শ্রমজীবী অসাম্প্রদায়িক , হিন্দু মুসলিম শিখ ধর্মাবলম্বীদের ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবী সংগ্রামের প্রতীক । সাম্যবাদ ছিল তাঁর রাজনৈতিক অনুপ্রেরনা । এভাবেই মানুষের মনে ,জনসংস্কৃতিতে উধাম সিং চিরঞ্জীব হয়ে আছেন ।

ভালো সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন

Back to top button