ভ্রমণ

ম্যানিয়াং পাড়ায় রাত্রি যাপণ

ভবঘুরের খেরো খাতা

3
ঘড়ের কোনায় গরুর দাত ঝুলিয়ে রেখেছে – ম্যানিয়াং পাড়া

খ্যামচং, আলীকদম, বান্দরবান: বান্দরবন জেলার আলিকদম থানার মুরং জনগোষ্ঠির ছোট্ট ছবির মতো সুন্দর একটি গ্রাম ম্যানিয়াং পাড়ায় আমরা রাত্রি যাপণ করতে যাচ্ছি। খাবার শেষ করতে করতে ১১টা পার হয়ে গেছে, এরপর ঘুমের পালা। ভোর রাতে রংরাং ও খ্যামচং পাড়ার পথে নামতে হবে তাই আজকের মত আর ক্যাম্পিং এর ঝামেলায় না যেয়ে ম্যানিয়াং দার নিকট থেকে কয়েকটি কম্বল নিয়ে, আমাদের সঙ্গে থাকা বালিশ, স্লিপিং ব্যাগ, চাদর সব বের করে ম্যনিয়াং দার ঘরের এক পাশে শোয়ার আয়োজন করা হলো। একটাই ঘর, এক পাশে রান্নার ব্যাবস্থা, এক পাশে পরিবারের লোক জনের থাকার ব্যাবস্থা, আর এক পাশে আমরা। সারাদিনের ট্রেকিং করে সকলেই ক্লান্ত, শুইতে না শুইতে সকলে ঘুম, কিন্তু আমার চোখে ঘুম নেই। পাড়াটা চাদের আলোয় ঘুরে না দেখা গর্যন্ত আমার ঘুম আসছিল না।

ভরা পূর্ণিমা রাতে ছোট্ট ছবির মত সুন্দর পাড়ায় ঘুরে বেড়ানোর লোভ সামলানো টা এতোটা সহজ নয়। পারলামও না, জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে বেড়িয়ে পরলাম। একটু পর দেখি ম্যানিয়াং মুরংও বেড়িয়ে এসেছেন। চাদের আলোয় গ্রামটা ঘুড়ে দেখছিলাম ও ম্যানিয়াং মুরং এর কাছ থেকে শুনছিলাম তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংষ্কৃতি ও উৎসবের কথা।

ম্যানিয়াং পাড়া একটি মুরং পাড়া, পাচ পরিবারের সকলেই মুরং। মুরং পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বপ্রাচীন জাতি এবং বান্দরবান জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতি। মুরংদের আদি নিবাস মায়নামারের আরাকান রাজ্য। আনুমানিক ১৪৩০ খ্রি: অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৫৯০ বছর আগে ম্রোরা বান্দরবান জেলার লামা, আলীকদম, থানছি ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় আশ্রয় নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। মুরংরা মূলত: প্রকৃতি পূজারী হলেও অধিকাংশই ‘বৌদ্ধ’ ধর্মাবলম্বী এবং ‘খিস্টান’ ধর্ম পালন করে। তবে কিছুদিন আগে মুরংদের মধ্যে একটা নতুন ধর্ম ‘ক্রামা’ আর্বিভাবের ফলে বর্তমানে মুরংদের একটি অংশ ক্রামা ধর্মের অনুসারি। সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে মুরং উপজাতিরা আরকান থেকে পালিয়ে আলীকদমের বিভিন্ন পাহাড়ী উপত্যকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। মুরং সম্প্রদায়ের সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। মুরংদের একটি অংশ আলীকদমের প্রত্যন্ত পাহাড়ী এলাকায় তাদের ‘‘কিম’’ ঘর তৈরী করে বসতি স্থাপন করেন। মুরংরা তাদের ঘরে জীব জন্তুর মাথা ঝুলিয়ে রেখে থাকে।

ম্যানিয়াং পাড়ার কয়েকটি শিশু
ম্যানিয়াং পাড়ার কয়েকটি শিশু

মুরং সম্প্রদায় মূলত: প্রকৃতি পুজারী। তারা ইহকালকেই স্বর্বস্ব জ্ঞান করেন। তাদের মতে পরকাল বলতে কিছুই নেই। মুরংদের ধর্মীয় বিধি নিষেধ সংবলিত কোন ধর্মগ্রন্থ নেই। তাদের ধর্মবিশ্বাসে আকীর্ণ প্রধান উৎসবের নাম হলো “চিয়া-ছট-প্লাই” অর্থাৎ গো-হত্যা উৎসব। গো-হত্যাকে ধর্মীয় অনুষঙ্গ হিসাবেই পালন করা হয়। প্রতিবছর জুমের ফসল ঘরে তোলার আগে মুরং সম্প্রদায় মহাধুমধামের সাথে এ উৎসব করে। এছাড়া এ সম্প্রদায়ের পরিবারে কারো অসুখ বিসুখ হলে তারা রোগ বালাই থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উদ্দেশ্যে ‘চিয়া-চট-প্লাই’ পালনের মানত করে থাকন। তারা “চাম্পুয়া” নামের অপর একটি উৎসব পালন করে থাকে। সৃষ্টিকর্তা তাদের ধর্মীয় বিধান কলাপাতায় লিপিবদ্ধ করেছিল বিশ্বাসে তারা কলাপাতা কেটে এ উৎসব করে থাকে। এ সম্প্রদায়ের অনেকে আবার ‘‘ক্রামা’’ নামের অপর একটি ধর্ম মতেও বিশ্বাস করে থাকে। মুরুং সম্প্রদায়ের কোন লোকের মৃত্যু হলে মৃতদেহ সপ্তাহ পর্যন্ত ঘরের মধ্যে রাখা হয়। মৃত ব্যক্তির পাশে শুকর, ছাগল ও মোরগ জবাই করে পরিবেশন করা হয়। মৃতকে নদী তীরবর্তী চিতায় দাহ করার আগ পর্যন্ত গান বাজনা ও নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে উল্লাস করা হয়।

পানি সংগ্রহ করার পাত্র - ম্যানিয়াং পাড়া
পানি সংগ্রহ করার পাত্র – ম্যানিয়াং পাড়া

ম্যানিয়াং মুরং এর কাছ থেকে গল্প শুনছিলাম ও চারপাশটা ঘুরে দেখছিলাম। এক-দেড় ঘণ্টা চারপাশে ঘুড়েও সাদ মিটলোনা। এ এক অদ্ভুত সৌন্দর্য, দুঃখ একটাই এই সৌন্দর্য ক্যামেরায় বন্দী করার সাধ্য আমার নেই। সাড়ে বারোটা একটার দিকে ঘরে এসে শুয়ে পরলাম। মধ্যরাত যখন পেরিয়ে গেছে ভোরের আলো ফোটেনি,তখন উঠে পড়তে হলো আমাদের। কারন আমরা দিনের রোদে ট্রেকিং করার চেয়ে রাতের বেলায় ট্রেকিং করাটাই পছন্দ করছি, রোদের মধ্যে পাহাড়ে ট্রেকিং করা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছিল। তাই আমরা চাচ্ছিলাম রাতে ট্রেকিং করে খুব ভোরে খ্যামচং পাড়ায় পৌঁছাতে। তাড়াতাড়ি সবাই রেডি হয়ে নেমে পড়লাম খ্যামচং – রংরাং এর পথে। (চলবে)

এমন আরো সংবাদ

Back to top button